ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হচ্ছে—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করে কট্টরপন্থি সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (Rashtriya Swayamsevak Sangh) বা আরএসএসের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন। একই সঙ্গে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (Research and Analysis Wing)—সংক্ষেপে ‘র’—এর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন কমিশন ইউএসসিআইআরএফ (United States Commission on International Religious Freedom) তাদের ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে দেশটিকে ‘কান্ট্রি অব পার্টিকুলার কনসার্ন’ বা সিপিসি হিসেবে ঘোষণা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এই শ্রেণিভুক্ত দেশগুলো সাধারণত সেইসব রাষ্ট্র, যেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত, ধারাবাহিক এবং গুরুতর লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে বলে মনে করা হয়।
১৯৯৮ সালের ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম অ্যাক্ট (International Religious Freedom Act) অনুযায়ী গঠিত ইউএসসিআইআরএফ একটি স্বাধীন ও দ্বিদলীয় মার্কিন ফেডারেল সংস্থা। বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা এবং সেই ভিত্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কংগ্রেসকে নীতিগত সুপারিশ প্রদান করাই এই কমিশনের প্রধান কাজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও তাদের উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে নতুন আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে ধর্মান্তরবিরোধী আইন আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং এসব আইনে কারাদণ্ডের বিধানও বাড়ানো হয়েছে।
একই সঙ্গে অভিযোগ করা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ নাগরিক ও ধর্মীয় শরণার্থীদের ব্যাপক আটক এবং অবৈধ বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপে জড়িত ছিল। পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় জড়িত উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি ঘটনার উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। মার্চ মাসে মহারাষ্ট্রে ১৭ শতকের মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব (Aurangzeb)–এর সমাধি অপসারণের দাবিকে ঘিরে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (Vishwa Hindu Parishad)–এর ডাকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু মানুষ আহত হন।
জুন মাসে ওডিশায় ভিএইচপি নেতৃত্বাধীন অন্তত ২০টি বিক্ষোভে কোরআন অবমাননার অভিযোগ ওঠে এবং হামলায় আটজন আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই ঘটনাগুলোতে পুলিশের কার্যকর হস্তক্ষেপ ছিল না বলেও দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া মে মাসে ৪০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আটক করে মিয়ানমারের উপকূলের আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাদের লাইফ ভেস্ট দিয়ে সাঁতরে তীরে যেতে বাধ্য করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
জুলাই মাসে আসামে শত শত বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যদিও তাদেরকে ভারতীয় নাগরিক বলেই দাবি করা হয়েছিল।
আর সেপ্টেম্বরে ফরেনার্স অ্যাক্ট–এর নতুন বিধির মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালগুলোকে সন্দেহভাজন বিদেশিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ও আটক করার ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
নীতিগত সুপারিশে ইউএসসিআইআরএফ বলেছে, ধর্মীয় স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘনের কারণে ভারতকে সিপিসি হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে টার্গেটেড নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস)–এর মতো সংগঠনের বিরুদ্ধে সম্পদ জব্দ এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।


