আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে লাখো মানুষ। কর্মব্যস্ত নগরজীবন পেছনে ফেলে পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামে ফিরছেন তারা। অনেক যাত্রী এখন পর্যন্ত ঈদযাত্রাকে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক বললেও, যাত্রার শুরুতেই বিভিন্ন কারণে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তার ছায়া।
দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে ইতোমধ্যে যানজটের শঙ্কা বাড়ছে। সড়কের বেহাল অবস্থা, অসম্পূর্ণ সংস্কার কাজ, মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ হাট-বাজার এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি পয়েন্টে ঈদযাত্রা থমকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর (Police Headquarters) হাইওয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
আজ মঙ্গলবার থেকে সরকারি অফিস এবং অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছুটি শুরু হওয়ায় রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রীর চাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গাবতলী বাস টার্মিনাল (Gabtoli Bus Terminal), সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল (Sayedabad Bus Terminal) এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল (Mohakhali Bus Terminal)-এ দূরপাল্লার বাসের অগ্রিম টিকিট প্রায় শেষ হয়ে গেছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ঈদের আগের সপ্তাহে সড়কে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু মহাসড়কের বর্তমান অবস্থা সেই বাড়তি চাপ সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুত নয়। ফলে কোথাও কোথাও দীর্ঘ যানজট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সংস্কারের চাপ
উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ১৬টি জেলার মানুষের প্রধান যাতায়াতপথ ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক (Dhaka–Aricha Highway)। প্রতিদিন হাজার হাজার বাস, ট্রাক এবং ব্যক্তিগত গাড়ি এই সড়ক ব্যবহার করে। ঈদের সময় এ চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু এবারের ঈদযাত্রায় এই মহাসড়কের একাধিক স্থানে তৈরি হয়েছে জটিলতা।
ধলেশ্বরী ব্রিজ এলাকায় যানবাহনের গতি অনেকটাই ধীর হয়ে পড়েছে। ব্রিজের প্রবেশপথ সরু হওয়ায় বড় যানবাহন একসঙ্গে চলাচল করতে পারে না। ফলে সামান্য চাপ বাড়লেই কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের আশঙ্কা দেখা দেয়।
এছাড়া নয়াডিঙ্গি এলাকায় চলমান সংস্কার কাজের কারণে সড়কের একাংশ বন্ধ রয়েছে। এতে যানবাহনকে এক লেনে চলতে হচ্ছে। বারইল, টেপরা এবং উথুলী বাসস্ট্যান্ড এলাকাতেও মহাসড়কের ওপর বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোর কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, এই কয়েকটি পয়েন্টই এ রুটে ঈদযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণাঞ্চলগামী সড়কেও সমস্যা
পদ্মা সেতু (Padma Bridge) চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় উন্নতি হলেও সব সমস্যার সমাধান হয়নি। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের টেকেরহাট এলাকায় প্রায়ই যানজট তৈরি হয়। এখানে একটি পুরোনো সরু ব্রিজ রয়েছে, যা বড় যানবাহনের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
এছাড়া বাসস্ট্যান্ড ও বাজারের কারণে সড়কের দুই পাশে প্রায়ই যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে সামান্য চাপ বাড়লেই যানজট তৈরি হয়। মোস্তফাপুর, গৌরনদী এবং ভাঙ্গা-বরিশাল বাসস্ট্যান্ড এলাকাতেও একই চিত্র দেখা যায়। সড়কের পাশে বাজার, ট্রাক পার্কিং এবং যত্রতত্র বাস থামানোর কারণে যানবাহনের গতি কমে যায়।
রাজবাড়ীর বড়পুল এলাকা এবং দৌলতদিয়া ঘাটের আশপাশেও দীর্ঘদিন ধরেই একই সমস্যা রয়েছে। ঈদের সময় গাড়ির চাপ বাড়লে এসব এলাকাতে দীর্ঘ যানজট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
খুলনা-যশোর মহাসড়কে সংস্কার কাজ
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ রুট ঢাকা-খুলনা মহাসড়কেও ঈদযাত্রায় ভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে। সড়কের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে এখনো সংস্কার কাজ চলছে। ফলে যান চলাচলে ধীরগতি দেখা দিতে পারে।
ফরিদপুরের কামারখালী টোলপ্লাজায় প্রায়ই যানজট তৈরি হয়। টোল আদায়ের ধীরগতির কারণে এখানে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ঈদের সময় গাড়ির সংখ্যা বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়া গোলচত্বরে বিভিন্ন জেলার যানবাহন মিলিত হওয়ায় এখানে সব সময়ই চাপ থাকে। ঈদের সময় সেই চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এছাড়া যশোরের প্রেমবাগ এলাকায় সড়কের অর্ধেক অংশ বন্ধ রেখে সংস্কার কাজ চলায় যানবাহনকে এক লেনে চলতে হচ্ছে। এতে প্রায় প্রতিদিনই যানজট তৈরি হচ্ছে।
নওয়াপাড়া এবং বাসুন্দিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকাতেও বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামার কারণে প্রায়ই যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে দখলদারিত্ব
দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক (Chattogram–Cox’s Bazar Highway)-এও ঈদযাত্রায় ভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে। শান্তিরহাট বাজার, দোহাজারী এবং গাছবাড়িয়া বাজার এলাকায় মহাসড়কের দুই পাশে বাজার বসায় প্রায়ই যানজট তৈরি হয়।
গাছবাড়িয়া কলেজ গেট এলাকায় নতুন ব্রিজ নির্মাণের কারণে রাস্তা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া কেরানীহাট চৌরাস্তা, পদুয়া বাজার, লোহাগাড়া এবং চকরিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকাতেও মহাসড়কের ওপর বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোয় যানজট তৈরি হয়।
সংযোগস্থলের জটিলতা
ফরিদপুর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের ঢাকা রাস্তা মোড় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। এখানে চারটি বড় সড়কের যানবাহন একসঙ্গে মিলিত হয়। ফলে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়। মাগুরা শহরের মধ্য দিয়ে যেসব দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করে, সেগুলোকেও একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। ঈদের সময় এই চাপ আরও বাড়ে।
ভোগান্তির মূল কারণ
বিশ্লেষণে কয়েকটি প্রধান কারণ সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ঈদের ঠিক আগে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সংস্কার কাজ শুরু হওয়া, মহাসড়কের পাশে অবৈধ হাট-বাজার এবং বাসস্ট্যান্ড গড়ে ওঠা, ট্রাফিক আইন অমান্য করা এবং উল্টো পথে গাড়ি চালানো। এসব কারণ মিলেই ঈদযাত্রায় ভোগান্তি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বাড়তি পুলিশ মোতায়েনের সুপারিশ
কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ঈদযাত্রায় বড় ধরনের দুর্ভোগ তৈরি হতে পারে বলে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বাজার এলাকায় অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েনের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কের চলমান সংস্কার কাজ দ্রুত শেষ করা অথবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথাও বলা হয়েছে।
এছাড়া মহাসড়কের পাশে অবৈধ বাজার উচ্ছেদ, নির্ধারিত স্থান ছাড়া বাস থামানো বন্ধ করা এবং টোলপ্লাজাগুলোতে দ্রুত টোল আদায়ের আধুনিক ব্যবস্থা চালুরও সুপারিশ রয়েছে।
দুশ্চিন্তায় ঘরমুখো মানুষ
ঈদ মানেই পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার আনন্দ। কিন্তু সেই আনন্দ যদি দীর্ঘ যানজটে আটকে যায়, তাহলে তা হয়ে ওঠে ক্লান্তিকর দুর্ভোগ।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী কামাল আহম্মেদ বলেন, প্রতি বছরই ঈদের সময় কয়েক ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হয়। এবারও একই পরিস্থিতি হবে কি না—তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
খোদ পুলিশ বিভাগের অন্তত চারজন কর্মকর্তা গতকাল সোমবার আমার দেশ-এর কাছে ঈদযাত্রায় মহাসড়কের সম্ভাব্য ভোগান্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একই ধরনের দুশ্চিন্তার কথা তুলে ধরছেন অনেকে। তাদের মতে, ঈদের আগে মহাসড়কের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান না করলে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানান, ঈদযাত্রায় ভোগান্তি কমাতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
