২৮ দিনে ২৮ পদক্ষেপ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞ’ তুলে ধরলেন মাহদী আমিন

সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের এক মাস পূর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নেওয়া ধারাবাহিক উদ্যোগগুলোকে “অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন তাঁর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। মঙ্গলবার সকালে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি সরকারের প্রথম ২৮ দিনের ২৮টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

মাহদী আমিন বলেন, আজ ১৭ মার্চ। ঠিক এক মাস আগে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party) সরকার গঠন করে। এই স্বল্প সময়েই নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ চলছে।

তার ভাষায়, সরকারের এই পদক্ষেপগুলো কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার বাস্তব প্রতিফলন। প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টাদের মধ্যে মাহদী আমিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের ২৮ দিনে নেওয়া এসব উদ্যোগ সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ—রাষ্ট্র পরিচালনার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে স্পর্শ করেছে।

সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তা

  1. ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি – ৩৭,৫৬৭ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কার্ডে মাসিক ২,৫০০ টাকা সহায়তা রয়েছে। মাত্র ২১ দিনের মধ্যেই এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যা সরকারের মানবিক অগ্রাধিকারের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

  2. ইমাম, মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় সেবকদের সম্মানী – ৪,৯০৮ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, ৯৯০ মন্দিরের পুরোহিত, ১৪৪ বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ এবং ৩৯৬ গির্জার যাজক ও পালকদের মাসিক সম্মানী প্রদান করা হচ্ছে।

  3. ঈদে ত্রাণ ও উপহার বিতরণ – নির্বাচনি এলাকার অসহায় ও দরিদ্র মানুষের জন্য শাড়ি, থ্রিপিস এবং হাজি রুমাল বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি সকল পরিচ্ছন্নতা কর্মীর জন্যও ঈদ উপহার দেওয়া হচ্ছে।

  4. প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থা – দরিদ্র মানুষের কাছে সম্পদ পৌঁছে দিতে এবং কল্যাণমূলক কার্যক্রম জোরদার করতে আলেম-মাশায়েখদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি

  1. কৃষক কার্ড ও কৃষিঋণ মওকুফ – প্রায় ২৭ হাজার কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়ার মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

  2. দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি – ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার কাজ ইতোমধ্যে ৫৪ জেলায় শুরু হয়েছে। এর ফলে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা হ্রাস এবং কর্মসংস্থান বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রশাসনিক সংস্কার ও সুশাসন

  1. সাপ্তাহিক অফিস সময় – প্রধানমন্ত্রী নিজে শনিবারও অফিস করছেন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সকাল ৯টার মধ্যে উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

  2. ভিভিআইপি প্রটোকল হ্রাস – প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ চলাফেরার কারণে ট্রাফিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে এবং সাধারণ মানুষও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে উৎসাহিত হচ্ছেন।

  3. বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা সীমিত – বিমানবন্দরে অভ্যর্থনার ক্ষেত্রে কেবল একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী, চিফ হুইপ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব উপস্থিত থাকবেন।

  4. এমপিদের বিশেষ সুবিধা বাতিল – শুল্কমুক্ত গাড়ি এবং সরকারি প্লট গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থনীতি ও বাজার স্থিতিশীলতা

  1. বাজার মনিটরিং ও জ্বালানি স্থিতিশীলতা – রমজান ও ঈদের সময় মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি জোরদার করা হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিতিশীলতার মধ্যেও বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে স্পট এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

  2. বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণ – ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে।

  3. শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস নিশ্চিতকরণ – সব শিল্পকারখানার শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাস সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করা হয়েছে। পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে ২,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

  4. রুগ্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু – পর্যায়ক্রমে সরকারি মালিকানাধীন বন্ধ কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

  5. স্থানীয় উদ্যোগ ও কর্মসংস্থান – স্বল্প ব্যবহৃত ইকোনমিক জোন, ইপিজেড, বিসিক এলাকা, হাই-টেক পার্ক এবং ইন্ডাস্ট্রি ক্লাস্টারের তালিকা প্রস্তুত করে সেখানে নতুন ব্যবসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে।

শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন

  1. পুনর্ভর্তি ফি বাতিল ও লটারি বাতিল – প্রতি বছর পুনরায় ভর্তি ফি বাতিল করা হয়েছে। লটারির পরিবর্তে আধুনিক ভর্তি পরীক্ষা বা সাক্ষাৎকার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে এবং শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

  2. বিদেশে উচ্চশিক্ষা সহায়তা – শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়াশোনার জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তায় সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

  3. ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ – নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জোরদারে ৯ হাজার শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

  4. ক্রীড়া উন্নয়ন ও নতুন কুঁড়ি কর্মসূচি – শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ শিশু-কিশোরদের জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং ‘নতুন কুঁড়ি’ কর্মসূচির মাধ্যমে সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও কোরআন তেলাওয়াত কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে ছয়টি খেলায় তিনজন করে মোট ১৮ জন ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ শুরু হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণ

  1. ই-হেলথ কার্ড – স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যাদের ৮০ শতাংশ নারী হবেন।

  2. ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান – সাপ্তাহিক জাতীয় পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটির সমন্বয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা

  1. চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা – গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

  2. নারীর নিরাপত্তা – নারী পরিচালিত ‘পিংক বাস’ চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সাইবার বুলিং প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ

  1. রাষ্ট্রীয় ইফতার সীমিতকরণ – সরকারি অফিসে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অর্ধেক ফ্যান ও এসি ব্যবহারের নির্দেশ এবং অপচয় রোধে রাষ্ট্রীয় ইফতার সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

  2. অবৈধ দোকান উচ্ছেদ – কক্সবাজার (Cox’s Bazar)-এর সুগন্ধা সমুদ্র সৈকতে প্রায় ২০ বছর পর অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং দেশজুড়ে একই ধরনের অভিযান চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

  3. শহীদ সেনা দিবস – ২৫ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ ঘোষণা করা হয়েছে এবং পিলখানা হ’\ত্যাকাণ্ড (Pilkhana Massacre)-এর স্বচ্ছ বিচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

  4. বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল – হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Hazrat Shahjalal International Airport)-এর তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ও কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।

  5. ফ্রি ইন্টারনেট ব্যবস্থা – ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নত দেশের মতো ফ্রি ওয়াইফাই চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সৈয়দপুর বিমানবন্দরে তা উদ্বোধন করা হয়েছে। পাশাপাশি চলন্ত ট্রেনেও ফ্রি ইন্টারনেট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্ট্যাটাসের শেষ দিকে মাহদী আমিন বলেন, সরকার গঠনের প্রথম ২৮ দিনের পদক্ষেপগুলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃঢ় নেতৃত্ব, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতারই প্রতিফলন। তাঁর নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করছে এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলেন—“সবাই মিলে করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।”