ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ, হার ৪২.৫০ শতাংশ

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চিত্র ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে দেওয়া ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে ব্যাংকগুলোর দেওয়া ঋণের ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে—যা সব খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ডিসেম্বরভিত্তিক ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতে সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণের গড়হার দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ২০ শতাংশে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের পর খেলাপি ঋণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শিল্প খাত। এ খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, ব্যবসায়িক পরিবেশের অবনতি এবং ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতেই সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে বাজারে পণ্যের চাহিদা কমেছে এবং অনেক ব্যবসা প্রত্যাশিত বিক্রি করতে পারছে না। একই সঙ্গে কাঁচামাল, জ্বালানি, পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন ও পরিচালন খরচও বেড়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলার সংকট ও এলসি খোলার জটিলতা। আমদানিনির্ভর অনেক ব্যবসা এই পরিস্থিতিতে বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ায় ঋণের বোঝাও বেড়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (এসএমই) বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। কারণ তাদের মূলধন সীমিত এবং বাজারের ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা তুলনামূলক কম।

ফলে অনেক ব্যবসায়ী নির্ধারিত সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। এর ফলেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট ঋণ স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা।

খাতভিত্তিক হিসাবে তৃতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রয়েছে কৃষি, মৎস্য ও বন খাতে। এ খাতে খেলাপি ঋণের হার ২৮ দশমিক ২০ শতাংশ। নির্মাণ খাতে খেলাপির হার ২৬ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং পরিবহন খাতে ২৩ দশমিক ২০ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে কম খেলাপি ঋণ রয়েছে ভোক্তা খাতে, যেখানে হার মাত্র ৩ শতাংশ।

এছাড়া অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক খাতে খেলাপির হার ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং বিবিধ খাতে ৯ দশমিক ২০ শতাংশ।

বড় ঋণেই খেলাপির হার বেশি

ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে বড় অঙ্কের ঋণগুলোতেই খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank)-এর তথ্য অনুযায়ী, ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণের মোট পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৩ দশমিক ৬০ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়েছে।

২০ কোটি থেকে ৩০ কোটি টাকার ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৩৫ দশমিক ৪০ শতাংশ খেলাপি। ৩০ কোটি থেকে ৪০ কোটি টাকার ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা এবং এ খাতে খেলাপির হার ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ।

৪০ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণের পরিমাণ ছিল ৭০ হাজার ১০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপির হার ৪৩ শতাংশ। আর ব্যাংক খাতের মোট ঋণের মধ্যে সর্বোচ্চ অংশ—৫ লাখ ৬১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা—ছিল ৫০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণ। এসব বড় ঋণে খেলাপির হার ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ।

সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি ছিল আরও খারাপ

গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে বড় ঋণগুলোতে খেলাপির হার আরও বেশি ছিল। তখন ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার ছিল ৪৮ শতাংশ। ২০ কোটি থেকে ৩০ কোটি টাকার ঋণে এই হার ছিল ৪০ দশমিক ৫০ শতাংশ।

৩০ কোটি থেকে ৪০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার ছিল ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ৪০ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণে ছিল ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ। সেই সময় ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে খেলাপির হার ছিল ৫১ শতাংশ।

পরে নীতি সহায়তা ও ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিছু ঋণ নিয়মিত হওয়ায় ডিসেম্বর শেষে খেলাপির হার কিছুটা কমেছে।

ছোট ঋণে খেলাপির হার তুলনামূলক কম

অন্যদিকে ছোট অঙ্কের ঋণে খেলাপির হার তুলনামূলকভাবে কম। ডিসেম্বর শেষে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

একই সময়ে ১ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং এর মধ্যে খেলাপির হার ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

এর আগে সেপ্টেম্বর শেষে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণে খেলাপির হার ছিল ১৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং ১ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণে ছিল ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ।