ঈদুল ফিতর ঘিরে দেশজুড়ে কড়া নিরাপত্তা: প্রযুক্তি ও নজরদারির সমন্বয়ে ভিন্ন প্রস্তুতি

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘরমুখো মানুষের ঢল, ফাঁকা হয়ে পড়া নগরী, কেনাকাটার ব্যস্ততা এবং ঈদের জামাত—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা, ট্রাফিক বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসন সম্ভাব্য অপরাধ ও নাশকতা প্রতিরোধে সক্রিয় রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও মানবিক তৎপরতার সমন্বয়ে এবারের ঈদে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এসেছে ভিন্নতা।

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে গিয়ে জানিয়েছেন, ঈদকে ঘিরে বড় কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই। জনসাধারণের জানমাল রক্ষায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

ফাঁকা ঢাকায় বাড়তি সতর্কতা

ঈদের সময় রাজধানী প্রায় অর্ধেক ফাঁকা হয়ে পড়ে—এই বাস্তবতা মাথায় রেখে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (Dhaka Metropolitan Police) বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। ফাঁকা বাসাবাড়ি ও অলিগলিতে চুরি-ডাকাতি কিংবা ছিনতাই রোধে টহল জোরদার করা হয়েছে কয়েকগুণ।

ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার জানিয়েছেন, নিয়মিত টহলের পাশাপাশি মোবাইল টিম, চেকপোস্ট এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে, যাতে উৎসব নির্বিঘ্নে উদযাপন করা যায়।

ঈদ জামাত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নজরদারি

রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানসহ দেশের বড় বড় ঈদগাহগুলোতে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। মেটাল ডিটেক্টর, আর্চওয়ে ও সিসিটিভির মাধ্যমে প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি আনসার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতা ঠেকানো যায়।

টার্মিনাল ও মহাসড়কে বাড়তি সতর্কতা

ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালসহ রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে কড়া নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কন্ট্রোল রুম, ওয়াচ টাওয়ার এবং অতিরিক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় ৬০০ অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

যাত্রী হয়রানি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মহাসড়কে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরির চলাচল নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সীমিত রাখা হয়েছে, যাতে যাত্রীবাহী যান নির্বিঘ্নে চলতে পারে।

সাইবার স্পেসেও নজরদারি

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। গুজব ছড়ানো বা উসকানিমূলক তথ্য প্রতিরোধে সাইবার ইউনিটগুলো ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে। ফেসবুক, এক্স ও টিকটকের মতো মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য যেন ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এবারের ঈদে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার আশঙ্কা না থাকলেও সতর্কতায় কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। ছিনতাই, চুরি, প্রতারণা, জাল নোট ও অনলাইন প্রতারণা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।

বিনোদন কেন্দ্রেও বাড়তি নিরাপত্তা

ঈদের ছুটিতে হাতিরঝিল, জাতীয় চিড়িয়াখানা, ফ্যান্টাসি কিংডমসহ বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র এবং কক্সবাজার ও সিলেটের মতো পর্যটন এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশের বাড়তি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোবাইল কোর্টও সক্রিয় রাখা হয়েছে।

ড্রোন নজরদারি ও গ্রামাঞ্চলে প্রস্তুতি

এবারের ঈদে বড় জনসমাগম পর্যবেক্ষণে ড্রোন ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলও কাজ করছে।

গ্রামাঞ্চলেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বাসস্ট্যান্ড, ফেরিঘাট ও বাজার এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।

নেটিজেনদের সতর্কতা ও সচেতনতা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মলম পার্টি’ বা অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা নিয়ে সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অপরিচিত কারও দেওয়া খাবার গ্রহণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। ফাঁকা বাসাবাড়ি টার্গেট করে সংঘবদ্ধ অপরাধের আশঙ্কায় নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে।

‘জিরো টলারেন্স’ নীতি

সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আওতায় যে কোনো অপরাধ কঠোরভাবে দমনের নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (National Security Intelligence) এবং পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছে।

নাগরিকদের নিজ বাসায় সিসিটিভি সচল রাখা, পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

র‍্যাবের তিন স্তরের নিরাপত্তা

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (Rapid Action Battalion) জানিয়েছে, তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একাধিক টিম, চেকপোস্ট, ফুট প্যাট্রোলিং ও গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে। ডগ স্কোয়াড ও বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

সদরঘাট ও সায়েদাবাদে কন্ট্রোল রুম চালু করে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, বাড়তি জনবল ও জনসচেতনতার সমন্বয়ে নিরাপদ ঈদ উপহার দেওয়ার লক্ষ্যেই এই প্রস্তুতি।

আগামী ২০ বা ২১ মার্চ পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অফিসের ছুটি শুরু হয়েছে, যা চলবে ২৩ মার্চ পর্যন্ত।