রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া (Daulatdia) ফেরিঘাটে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক বাসডুবির ঘটনায় এখনও রয়ে গেছে অসংখ্য প্রশ্ন। পন্টুন থেকে হঠাৎ করেই কেন বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মার গভীরে তলিয়ে গেল—এ নিয়ে দুই দিন ধরে চলছে নানা আলোচনা, অনুমান আর জল্পনা। কেউ বলছিলেন চালক বাস চালাচ্ছিলেন না, কেউ বলছিলেন ডোবার আগেই তিনি বের হয়ে গিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে, চালক নিজেই বাসটি চালাচ্ছিলেন এবং তার মরদেহও উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত বাসচালক আরমান খান (৩১), রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার পশ্চিম খালখুলা গ্রামের বাসিন্দা। কী ঘটেছিল সেই শেষ কয়েক সেকেন্ডে—যে মুহূর্তে তিনি আর বাসটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি—তা জানতে অনুসন্ধান চালিয়েছে জাগো নিউজ (Jago News)। চালক, মেকানিক, প্রত্যক্ষদর্শী, বেঁচে যাওয়া যাত্রী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে সম্ভাব্য কিছু কারণ।
ঈদের আনন্দ শেষে জীবিকার টানে রাজধানীতে ফিরছিলেন অনেকেই। কারও ব্যাগে ছিল গ্রামের খাবার, কারও সঙ্গে ছিল স্বপ্নভরা পরিকল্পনা। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না—একটি দুর্ঘটনায় নিভে গেলো ২৬টি প্রাণ। শোকের ছায়া নেমে এসেছে অসংখ্য পরিবারে।
দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে ফেরির অপেক্ষায় থাকা সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি হঠাৎ সামনে এগিয়ে গিয়ে নদীতে পড়ে যায়। মুহূর্তেই আনন্দমুখর যাত্রা রূপ নেয় বিভীষিকায়। চিৎকার, আর্তনাদ আর বাঁচার আকুতি মিলিয়ে যায় নদীর গভীরে।
প্রায় ছয় ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাসটি উদ্ধার করা হয়। ততক্ষণে প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন। উদ্ধার হওয়া বাসের স্টিয়ারিংয়ে তখনও চাবি লাগানো ছিল। পাশে ঝুলছিল সাবান, ছিল একটি তালাও—যেন থেমে যাওয়া জীবনের নিঃশব্দ সাক্ষী।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ফেরির অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় হঠাৎ করেই বাসটি সামনে এগিয়ে যায়। কেউ কিছু বোঝার আগেই ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চালক ব্রেক চাপলেও তা কাজ করেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক বাসে ইঞ্জিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় স্টার্ট দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক চাপলে তা কার্যকর হতে সময় লাগে। এই বাসের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটতে পারে।
প্রাথমিকভাবে অনেকে ধারণা করেছিলেন চালক নিজে বাস চালাচ্ছিলেন না। তবে যাত্রীদের একাধিক বক্তব্যে নিশ্চিত হওয়া যায়, কুমারখালী থেকে যিনি বাস চালাচ্ছিলেন, তিনিই ফেরিতে ওঠার চেষ্টা করছিলেন। পরে তার মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
মেকানিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসটির ব্রেকের ‘এয়ার প্রেসার’ বা হাওয়া কমে যাওয়ায় নিয়ন্ত্রণ হারান চালক। বিশেষ করে টাটা কোম্পানির কিছু মডেলের বাসে ইঞ্জিন বন্ধ থাকলে ব্রেকে প্রয়োজনীয় চাপ থাকে না।
ঢাকা-খুলনা রুটের অভিজ্ঞ চালক মোকলেসুর রহমান বলেন, এয়ার ব্রেক সিস্টেমে সমস্যা হলে মুহূর্তেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বেঁচে যাওয়া যাত্রী আবুল কালাম জানান, দুর্ঘটনার দুই মিনিট আগে তিনি যানজটের কারণে বাস থেকে নেমে যান। তার ভাষ্য, ‘যে চালক বাস চালাচ্ছিলেন, তিনিই ফেরিতে তুলছিলেন। তার কোমরে ড্রাইভিং লাইসেন্স ঝোলানো ছিল।’
সৌহার্দ্য পরিবহনের আরেক চালক আসলাম বলেন, ইঞ্জিন বন্ধ থাকলে ব্রেকের হাওয়া কমে যায়। স্টার্ট দেওয়ার পর হাওয়া পূর্ণ হতে কিছু সময় লাগে। চালক যদি তা না দেখেই গাড়ি চালান, তবে ব্রেক কাজ নাও করতে পারে।
একই মত দিয়েছেন অভিজ্ঞ চালক আফজাল হোসেন ও মেকানিক বাবুল ইসলাম। তাদের মতে, ব্রেকের এয়ার সিস্টেম ঠিক না থাকলে চালকের কিছুই করার থাকে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET)-এর অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, এটি একটি আধুনিক এয়ার ব্রেক সিস্টেমের সমস্যা হতে পারে। কেন এই সিস্টেম ব্যর্থ হলো তা খুঁজে বের করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, শুধু যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, পন্টুনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে। রেলিং যদি আরও উঁচু হতো, তাহলে হয়তো বাসটি নদীতে পড়ত না। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
গোয়ালন্দ (Goalanda) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা চলছে, যা তদন্ত শেষে পরিষ্কার হবে।

