মুন্নী সাহার এফডিআরে কোটি টাকার গরমিল, অনুসন্ধানে দুদক

টেলিভিশন সাংবাদিকতার পরিচিত মুখ মুন্নী সাহা (Munni Saha)-র ব্যাংক হিসাব ও স্থায়ী আমানতে (এফডিআর) বড় অংকের গরমিল পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক – Anti-Corruption Commission)। জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসায় তাকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় তার সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, আয়কর রিটার্ন, আয়ের উৎস, মোট সম্পদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়। তদন্তে দেখা গেছে, তার এফডিআরের প্রায় ১২ কোটি টাকার হিসাব মিলাতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক সাবেকুল নাহার পারুল জানিয়েছেন, মুন্নী সাহার সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান এখনও চলমান রয়েছে এবং শিগগিরই তা শেষ হতে পারে।

দুদকের তথ্যমতে, ২০২৫ কর বর্ষ পর্যন্ত মুন্নী সাহার নামে এক কোটি ৮৫ লাখ ৩২ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ১১ কোটি ৯৬ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। সব মিলিয়ে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বিপরীতে একই সময়ে তার গ্রহণযোগ্য আয় ছিল মাত্র তিন কোটি ২৪ লাখ ২৩ হাজার টাকা।

অন্যদিকে, তার স্বামী কবীর হোসেনের নামে দুই কোটি ১২ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ১৪ কোটি ৫৫ লাখ ৮৯ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে তার মোট সম্পদ ১৬ কোটি ৬৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা, যেখানে তার গ্রহণযোগ্য আয় ছিল আট কোটি ১৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা।

এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুন্নী সাহার একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ১২০ কোটি টাকা উত্তোলনের তথ্যও উঠে এসেছে। বর্তমানে ওই অ্যাকাউন্টে ১৪ কোটি টাকা স্থিতি রয়েছে, যার মধ্যে ১২ কোটি টাকার বৈধ উৎস দেখাতে পারেননি তিনি। এই বিপুল অংকের অর্থ ১৭টি ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে বলে জানা গেছে। গুলশান ও কাওরান বাজারের ওয়ান ব্যাংকের শাখা থেকে এসব টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

বিধিবহির্ভূত লেনদেনের অভিযোগে ইতোমধ্যে তার ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (Bangladesh Financial Intelligence Unit – BFIU)। একইসঙ্গে তার স্বামীর মালিকানাধীন এমএস প্রমোশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবেও তদন্ত চলছে, যেখানে তিনি নমিনি হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।

দুদকের উপ-পরিচালক ইয়াছির আরাফাত আদালতে তার ও তার স্বামীর ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আবেদন করেছেন। আবেদনে বলা হয়েছে, অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন এবং জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করেছেন মুন্নী সাহা, যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে মুন্নী সাহা সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি এবং অসংলগ্ন তথ্য দিয়েছেন। তিনি এ বিষয়ে সময় চেয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কমিশনার জানিয়েছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করা হতে পারে। ইতোমধ্যে তার কাছে আয়-ব্যয়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, দুদকের অনুসন্ধান কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে তদবির চালানোর অভিযোগও উঠেছে। তবে কমিশন তাদের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মুন্নী সাহার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য, মুন্নী সাহাকে সম্প্রতি এটিএন নিউজ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গু’\লিতে এক শিক্ষার্থী নি’\হত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি হিসেবেও তার নাম রয়েছে। কয়েক মাস আগে কাওরান বাজার এলাকায় বিক্ষুব্ধ জনতার মুখোমুখি হলে তাকে ডিবি পুলিশ হেফাজতে নেয়, পরে মুচলেকায় মুক্তি দেওয়া হয়।