এবারের ঈদযাত্রা যেন উৎসবের আনন্দের বদলে রূপ নিয়েছে শোকের দীর্ঘ মিছিলে। মাত্র নয়দিনেই সারাদেশে অন্তত ২৬৯টি সড়ক, রেল ও নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে অন্তত ২৩০ জনের। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান সামনে এনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায়। গত ২৫ মার্চ ফেরিতে ওঠার সময় একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে গেলে এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই একটি ঘটনাই যেন ঈদযাত্রার সার্বিক ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
এর আগে ১৭ মার্চ দুপুর থেকে ২৪ মার্চ দুপুর পর্যন্ত আট দিনে ২৬৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২০৪ জন নি’\হত হয়েছেন। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন (Road Safety Foundation)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, এই সময়ের মধ্যে দেড় হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। জানুয়ারি মাসে দেশে ৫৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নি’\হত হন ৪৮৭ জন, আহত হন ১ হাজার ১৯৪ জন। এর মধ্যে নারী ৬৮ জন এবং শিশু ৫৭ জন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নি’\হত ১৯৬ জন, যা মোট মৃত্যুর ৪০ শতাংশেরও বেশি। পথচারী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩২ জন—যা মোট নি’\হতের প্রায় ২৭ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারিতেও চিত্র খুব ভিন্ন ছিল না। ওই মাসে ৫১৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় নি’\হত হন ৪৩২ জন এবং আহত হন ১ হাজার ৬৮ জন। নারী ৫৬ জন এবং শিশু ৬২ জন প্রাণ হারান। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নি’\হতের হার এখানেও ৪০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল।
রেল ও নৌপথেও নিরাপত্তাহীনতা স্পষ্ট। জানুয়ারিতে চারটি নৌ-দুর্ঘটনায় ছয়জন নি’\হত এবং সাতজন আহত হন। একই সময়ে ৪১টি রেল দুর্ঘটনায় ৩২ জন নি’\হত হন। ফেব্রুয়ারিতে আটটি নৌ দুর্ঘটনায় তিনজন এবং ৪৩টি রেল দুর্ঘটনায় ২৮ জন নি’\হত হন।
সংস্থাটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে প্রতিদিন গড়ে ১৫ দশমিক ৭০ জন এবং ফেব্রুয়ারিতে ১৫ দশমিক ৪২ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। যদিও এই হার সামান্য কমেছে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটি কোনো স্থায়ী উন্নতির ইঙ্গিত নয়।
সাইদুর রহমান বলেন, “ঈদযাত্রার কয়েকদিনেই এত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এখনও মার্চ মাসের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রাথমিকভাবে যানবাহনের অব্যবস্থাপনা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাকেই মূল কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।” তিনি সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের ওপর জোর দেন।
রাজধানীর চিত্রও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৫ সালে ঢাকায় ৪০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নি’\হত হয়েছেন ২১৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৫১১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৭৬ জন, নারী ২৫ জন এবং শিশু ১৮ জন।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে রাতে—মোট ঘটনার ৪১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এছাড়া সকালে ১৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতে ভারী যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং বাইপাস সড়কের অভাব এই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
যানবাহনের ধরন অনুযায়ী দুর্ঘটনায় ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি—৩৫ দশমিক ১৪ শতাংশ। এরপর বাস ২৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং মোটরসাইকেল ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড এবং বিমানবন্দর সড়ক এখন দুর্ঘটনার হটস্পটে পরিণত হয়েছে। যানজটের কারণে চালকদের ধৈর্যহীনতা, অসহিষ্ণুতা এবং বেপরোয়া আচরণও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনার ফল নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল নজরদারি এবং অকার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থার প্রতিফলন। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই মৃত্যুমিছিল থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।
