গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেননি। কিন্তু পরিস্থিতির ভেতরের চাপ যে কতটা গভীর, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এই সপ্তাহান্তেই যু’\দ্ধ শেষ করতে কোনো চুক্তির দিকে যেতে পারেন— এমন আশঙ্কায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (Benjamin Netanyahu) তার জেনারেলদের আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তুগুলোতে সর্বাত্মক আ’\ক্রমণ চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং পারস্য উপসাগর থেকে তেল-গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার বাস্তবতা ট্রাম্পের অবস্থানকে দুর্বল করে তুলেছে। তার ইরান ‘অভিযান’ এখন দ্রুত সমাপ্তির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অথচ একই সময়ে তিনি নতুন করে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে দুটি মেরিন এক্সপেডিশনারি গ্রুপ এবং ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্যারাট্রুপারদের একটি বড় ইউনিট পাঠানো হয়েছে— যেখানে সৈন্য সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি।
পেন্টাগন (Pentagon) থেকে ফাঁস হওয়া তথ্য বলছে, এই বাহিনী উত্তর উপসাগরের খার্গ দ্বীপের তেল টার্মিনাল এবং হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত লারাক দ্বীপ দখলের চেষ্টা করতে পারে।
তবে কোনো আনুষ্ঠানিক যু’\দ্ধবিরতি চুক্তি ছাড়া কমান্ডো ও প্যারাট্রুপার মোতায়েন করে জোরপূর্বক পথ তৈরি করার চেষ্টা— এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই ধরনের পদাতিক অভিযান মূল পরিকল্পনার অংশই ছিল না। শুরু থেকেই পুরো পরিকল্পনাটি অস্পষ্ট ছিল। এমনকি অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘থাড’ (THAAD)-এর প্রয়োজনীয়তাও আগে বিবেচনায় আনা হয়নি। এখন তা তড়িঘড়ি করে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সরিয়ে এনে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।
সামরিক পরিভাষায় একটি শব্দ আছে— ‘মিশন ক্রিপ’। এর অর্থ, একবার কোনো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাহিনী মোতায়েন করা হলে ক্রমাগত নতুন হুমকি মোকাবিলায় সেই অভিযান বিস্তৃত হতে থাকে। ইতিহাস বলছে, এটি বিপজ্জনক। ২০০৩ সালের ইরাক এবং ২০০১ সালের আফগানিস্তানে ব্রিটেনের ভূমিকা ছিল তার বড় উদাহরণ। মাত্র ৩ হাজার সৈন্য নিয়ে শুরু করা হেলমান্দ অভিযান একসময় প্রায় ২০ হাজারে গিয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমানে ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহ (Hezbollah)-এর মতো প্রক্সি শক্তির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কার্যক্রমে একই ধরনের বিস্তারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তারা ‘এসকেলেশন ম্যানেজমেন্ট’ বা উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে। কিন্তু এই ধারণাটি এক ধরনের বিপজ্জনক যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে— দ্রুত যু’\দ্ধ থেকে বের হতে চাইলে আগে উত্তেজনা বাড়াতে হবে।
বাস্তবে খুব কম ইসরায়েলি এই যু’\দ্ধের দ্রুত সমাধান আশা করেন। বরং অনেক বাস্তববাদী সামরিক পরিকল্পনাকারী ‘ঘাস কাটা’ কৌশলের কথা বলছেন। এই ধারণা অনুযায়ী— হামাস, হিজবুল্লাহ, আইআরজিসি কিংবা ইরানের মতো শক্তিকে একবারে পরাজিত করা সম্ভব নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধারাবাহিকভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
২০১৮ সাল থেকে গাজায় এই কৌশলটি কার্যত একটি মতবাদে পরিণত হয়েছে। হামাসের বিরুদ্ধে লড়াইকে সেখানে ‘ঘাস কাটা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়— কারণ তারা বারবার নতুন যোদ্ধা তৈরি করে।
এখানে একটি নীরব বাস্তবতা রয়েছে— ইরানের শাসনব্যবস্থা এবং তাদের নিরাপত্তা কাঠামো এখনো ধ্বংসের কাছাকাছিও নয়। আফগানিস্তানের হেলমান্দে তালেবানদের বিরুদ্ধে লড়াই করা ব্রিটিশ কমান্ডাররাও একসময় উপলব্ধি করেছিলেন— তারাও একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি এক ‘ঘাস কাটা’ অভিযানে জড়িয়ে পড়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে সামরিক আলোচনায় দুটি পুরনো কিন্তু জরুরি শব্দ আবার ফিরে আসা প্রয়োজন— ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ (বের হওয়ার কৌশল) এবং ‘এন্ড স্টেট’ (অভিযানের চূড়ান্ত লক্ষ্য)। বর্তমানে ‘অফ র্যাম্প’ সমাধানের কথা বলা হচ্ছে— যা মূলত সংকট থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার একটি অস্থায়ী ধারণা।
কিন্তু ট্রাম্পের এই অভিযানের শুরুতেই একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য এবং সেখান থেকে সম্মানের সঙ্গে ফিরে আসার পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল। পিট হেগসেথ (Pete Hegseth)-এর পেন্টাগনের চিন্তাধারা যেন অনেকটা ভিডিও গেমের মতো— যেখানে বাস্তবতার জটিলতা অনুপস্থিত।
এখন সামরিক জগতের একটি পুরনো সতর্কবাণী আবার সামনে আসছে— ‘ব্যর্থতাকে কখনো শক্তিশালী করো না’। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের এই যু’\দ্ধের কুয়াশার মধ্যে আশঙ্কা বাড়ছে— ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ এবং ‘এপিক ফিউরি’ ঠিক সেই ভুলের দিকেই এগোচ্ছে। তারা তাদের অভিযানের পরিধি বাড়াচ্ছে, আর একটি সম্ভাব্য ব্যর্থতাকে টিকিয়ে রাখতে আরও বেশি শক্তি ও সম্পদ ব্যয় করছে।
দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে অনুদিত
এসএম


