ওয়ান-ইলেভেনের গোপন বৈঠক, রিমান্ডে বিস্ফোরক তথ্য: শেখ হাসিনার সঙ্গে রাতের সমঝোতার দাবি

বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেন (১/১১) সরকারের সময় রাতের আঁধারে শেখ হাসিনার সঙ্গে গোপন বৈঠকের তথ্য উঠে এসেছে রিমান্ডে থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে। নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র বলছে, কারাবন্দি অবস্থায়ও শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina)-র সঙ্গে নিয়মিত গোপন বৈঠক করতেন তৎকালীন সরকারের কুশীলবেরা, যা চলত তার কারামুক্তির আগ পর্যন্ত।

এই বৈঠকগুলোর সমন্বয় করতেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ টি এম আমিন। রিমান্ডে দেওয়া তথ্যে দাবি করা হয়, ভারতের পরিকল্পনায় ১/১১ সরকারের প্রধান কুশীলব সাবেক সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ (Moeen U Ahmed) ও সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদের পক্ষ থেকে এই সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তবে সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (Masud Uddin Chowdhury) দাবি করেছেন, এসব বৈঠকে তিনি সরাসরি অংশ নেননি।

পল্টন থানার মানব পাচার মামলায় প্রথম দফার পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল রোববার তাকে আবারও ছয় দিনের রিমান্ডে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম (Jashita Islam)-এর আদালত। তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক মো. রায়হানুর রহমান তার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন।

এদিকে ১/১১ সরকারের আরেক আলোচিত ব্যক্তি, ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদ (Sheikh Mamun Khaled)-ও রিমান্ডে নানা তথ্য দিয়েছেন, যদিও তা নিয়ে বিভ্রান্তির অভিযোগ উঠেছে। তিনি দাবি করেন, সে সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন এবং তার কারামুক্তিতেও ভূমিকা রেখেছিলেন।

গত ২৫ মার্চ গভীর রাতে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে দেলোয়ার হোসেন হ’\ত্যা মামলায় তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ৩০ মার্চ। তাকে আবারও রিমান্ডে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক থাকাকালে শেখ মামুন খালেদ সাধারণ মানুষ, রাজনীতিক এবং সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন। এছাড়া জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে দুর্নীতির মাধ্যমে এক হাজার এক কোটি ৪০ হাজার টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ১/১১ সরকারের সময় চাঁদাবাজির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ থাকলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (Masud Uddin Chowdhury) দাবি করেন, ১/১১ সরকারের পেছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর পরিকল্পনা ছিল। ২০০৬ সালের শেষদিকে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় থেকেই এই পরিকল্পনা শুরু হয় বলে জানান তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক অফিসের সঙ্গে সমন্বয়ের নামে ভুয়া চিঠি তৈরি করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করা হয়।

তিনি আরও দাবি করেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টন এলাকায় লগি-বৈঠা দিয়ে চারজন নেতাকর্মীকে হ’\ত্যা এবং পরবর্তী সহিংসতা ছিল একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, যার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হয়। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদের সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করা হয়।

তার দাবি, বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনাও ছিল ১/১১ সরকারের। একইসঙ্গে কর্নেল (অব.) অলির সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

অন্যদিকে, ‘ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল’ নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর আড়ালে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে মাসুদ এখনো কিছু স্বীকার করেননি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচারের মামলাও হয়েছে, যা তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

রিমান্ড শুনানিতে ঢাকা মহানগর প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী (Omar Faruk Faruqi) বলেন, ১/১১ সময়ে এই আসামি ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের হেনস্তা করতেন এবং ক্ষমতার বিনিময়ে নানা সুবিধা ভোগ করেছেন। তার মতে, মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

মামলার বাদী আলতাব খান অভিযোগ করেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নামে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে বিপুল অর্থ আদায় করত। সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ অন্তত ১২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এ চক্রের কারণে তার আরও প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা মো. রায়হানুর রহমান আদালতকে জানান, প্রথম দফার রিমান্ডে কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন আসামি। বিশেষ করে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভূমিকা এবং আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারের বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে তাকে পুনরায় রিমান্ডে নেওয়া জরুরি।