“অথচ এই সম্পদ দখল না হলে আমরা ভালো থাকতাম আর্থিকভাবে”—স্থানীয়দের এমন আক্ষেপের মধ্যেই সামনে আসছে এক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অনিয়ম ও প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের অভিযোগ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পুলিশের কর্মকর্তা গাজী মোজাম্মেলের উপার্জিত বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলের দাবি। এই অর্থের মাধ্যমে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের বিদেশে বাড়ি, গাড়ি ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে, এমন অভিযোগও রয়েছে।
বিশেষ করে আলোচনায় এসেছে :contentReference[oaicite:0]{index=0}–কে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি বিস্তৃত পরিমণ্ডল। জানা গেছে, ‘বেনজীর পরিবার’ বলতে শুধু তাঁর আত্মীয়স্বজনই নয়, তাঁর অধীনস্থ কিছু পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাকেও বোঝানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মোজাম্মেলের অর্থায়নে এসব ব্যক্তি ভারতসহ ইউরোপ, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। সেখানে দামি অ্যাপার্টমেন্ট, বিলাসবহুল গাড়ি এবং উচ্চমানের জীবনযাত্রার সুবিধা ভোগ করছেন তাঁরা।
একাধিক সূত্র জানায়, ‘আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি’ নামের একটি আবাসন প্রকল্পের সঙ্গে ‘পুলিশ’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে মূলত ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে। এই প্রকল্পে বেনজীর আহমেদকে একটি প্লট উপহার দিয়েছিলেন মোজাম্মেল, যেখানে তিনি একটি বাড়িও নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে :contentReference[oaicite:1]{index=1} সেই বাড়ি জব্দ করেছে।
সূত্রগুলো বলছে, ক্ষমতার প্রভাব প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই বেনজীরকে ওই প্লট দেওয়া হয়েছিল। একইসঙ্গে তাঁর নাম ব্যবহার করে নানা সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে।
উল্লেখ্য, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ বর্তমানে দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিংয়ের গুরুতর অভিযোগে পলাতক রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন, যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাঁর সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তাঁর ও তাঁর পরিবারের নামে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিপুল জমি, রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট এবং নানা ব্যবসায় বিনিয়োগ রয়েছে। তদন্ত শুরু হওয়ার পর তিনি সপরিবারে দেশ ছেড়ে চলে যান।
এদিকে, গাজী মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি ‘আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি’ প্রকল্প। যদিও নামের সঙ্গে ‘পুলিশ’ যুক্ত, সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন—এর সঙ্গে সরকারি কোনো অনুমোদন বা সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অনেক ক্ষেত্রে জোরপূর্বক জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। মানুষকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, এমনকি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি ছেড়ে দিয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ ওঠার পরও মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে তিনি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই কর্মকাণ্ডে মোজাম্মেল একা নন—তাঁর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই চক্র প্রশাসন, ব্যবসা ও রাজনীতির বিভিন্ন স্তরে সক্রিয়। তাদের সহযোগিতায় অবৈধ অর্থ সংগ্রহ, পাচার এবং বিনিয়োগের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।
ফলে বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত দুর্নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ সরকারের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সুধীসমাজ ও সচেতন নাগরিকরা ইতোমধ্যে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, গাজী মোজাম্মেলের সম্পদের উৎস, বিদেশে অর্থ পাচারের পথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত করে তা দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও জরুরি।
অপরাধ বিশ্লেষক :contentReference[oaicite:2]{index=2} বলেন, “এদের ওপর কার্যকর কোনো মনিটরিং নেই। আগে কী সম্পদ ছিল, চাকরিজীবনে কতটা অর্জন করেছে—এসব যাচাই করা হয় না। তারা নিজেদের নামে কিছু না করে নামে-বেনামে সম্পদ গড়ে তোলে। এতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, আর অন্যরাও উৎসাহিত হয়।”
তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি ছাড়া এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
