ইরান যুদ্ধ: সামরিক দাবির আড়ালে কৌশলগত বাস্তবতা, কোথায় দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বারবার বিমান হা’\মলা নিয়ে নিজেদের সাফল্যের গল্প শোনালেও বাস্তবতার চিত্র ভিন্ন এক জটিল সংকেত দিচ্ছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই তারা দাবি করেছিল, ইরানের ৭৫ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে সেই দাবিকে আরও এগিয়ে নিয়ে বলা হয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হা’\মলা ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন সময়ে তারা ‘ইতোমধ্যেই যুদ্ধে জয়ী’ হওয়ার কথাও উচ্চারণ করেছে।

কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা এই ঘোষণাগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় ইরান ধারাবাহিকভাবে তেল শোধনাগার ধ্বংস এবং ট্যাংকার চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। এতে বোঝা যায়, সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৌশলগত দিক থেকে ইরান এখনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

এ পর্যন্ত যুদ্ধে ইরান অন্তত পাঁচ হাজার ৪০০টি প্রজেক্টাইল—অর্থাৎ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন—নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে দশ শতাংশেরও কম সরাসরি ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছে। যুদ্ধের প্রথম চার সপ্তাহে ইসরাইল প্রায় ৪৫০টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হা’\মলার মুখোমুখি হয়েছে। প্রথম সপ্তাহের পর হা’\মলার হার দ্রুত কমে এলেও তা কখনো পুরোপুরি থামেনি।

ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র কয়েকশ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক বহনে সক্ষম, যা একটি সম্পূর্ণ ভবন ধ্বংস করতে পারে। অন্যদিকে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র বিস্তৃত এলাকায় ক্লাস্টার বোমা ছড়িয়ে দেয়। এগুলো তুলনামূলক কম শক্তিশালী হলেও প্রাণঘাতী।

ইসরাইল তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দূরপাল্লার শেল ইন্টারসেপ্টর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে, পাশাপাশি মাঝারি পাল্লার ‘ডেভড’স স্লিং’ এবং স্বল্প পাল্লার ‘আয়রন ডোম’ ব্যবহার করে। তাদের দাবি অনুযায়ী, সম্মিলিতভাবে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধেয়ে আসা ৯২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ‘আয়রন বিম’ লেজার প্রযুক্তি এখনো এই যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়নি।

তবুও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। কিছু ইন্টারসেপ্টর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, আবার সরবরাহও সীমিত। ফলে অন্তত ৯টি বড় ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৫০টি ক্লাস্টার বোমা ইসরাইলের জনবহুল এলাকায় আঘাত হেনেছে। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এতটাই নির্ভুল যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো প্রতিহত করা জরুরি হয়ে পড়ছে। অতীতে গাজা সংঘাতগুলোতে ছোড়া রকেটগুলোর তুলনায় এই নির্ভুলতা অনেক বেশি।

এই সংঘাতে ইসরাইলে অন্তত ২০ জন নি’\হত হয়েছেন। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০০টি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে প্রায় চার দশমিক একজন নি’\হত হচ্ছেন। এটি ২০২৫ সালের সংঘাতের তুলনায় কিছুটা কম হলেও গাজা ও লেবাননের পূর্ববর্তী সংঘাতগুলোর তুলনায় চার থেকে ৪০ গুণ বেশি।

অন্যদিকে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন পারস্য উপসাগরের আরব দেশগুলোর দিকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। সৌদি আরব, জর্ডান, ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত মিলে প্রথম চার সপ্তাহেই প্রায় চার হাজার ৯০০টি হা’\মলার তথ্য দিয়েছে।

এই হা’\মলাগুলোর মধ্যে মাত্র এক-পঞ্চমাংশ ছিল ক্ষেপণাস্ত্র, বাকিগুলো ছিল ড্রোন। ১০ মার্চ পর্যন্ত শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতই এক হাজার ৮৩৫টি ড্রোন, ৩৭৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হা’\মলার কথা জানায়। দেশটি দাবি করেছে, তারা ৯৪ শতাংশ ড্রোন এবং ৯৯ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে।

এই আরব দেশগুলো নিজেদের নিরপেক্ষ বলে দাবি করলেও বাস্তবে তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে এবং বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিও অবস্থান করছে। তারা প্যাট্রিয়ট এবং স্পাইডারের মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করছে।

পারস্য উপসাগরে ইরানের হা’\মলায় অন্তত ১৫ জন বেসামরিক নাগরিক, যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন সৈন্য এবং সাতজন বাণিজ্যিক নৌসেনা নি’\হত হয়েছেন। কুয়েত, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রতি ১০০টি হা’\মলায় গড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ছয়জন নি’\হতের ঘটনা ঘটেছে, যা ইসরাইলের তুলনায় অনেক কম। এর পেছনে ড্রোন ও ছোট আকারের ওয়ারহেডযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কৌশল ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহের পর আরব দেশগুলোতে হা’\মলার সংখ্যা কমলেও এর প্রাণঘাতী ক্ষমতা কমেনি। মৃত্যুহারের ক্ষেত্রেও তেমন বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে ইসরাইলে এই হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখন অত্যন্ত নির্ভুলভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে—যেমন রানওয়ের পাশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমান। এতে ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধের শুরুতে ধাক্কা কাটিয়ে ইরান এখন কৌশলগতভাবে আরও সংগঠিত হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তা এবং চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বাহিনী হাজার হাজার বোমা ফেলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে এবং বহু বেসামরিক নাগরিক নি’\হত হয়েছে। এতে ইরানের হা’\মলার গতি কিছুটা মন্থর হলেও তা পুরোপুরি থামানো যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে ‘সামরিক বিজয়’ নিয়ে নানা বক্তব্য দিলেও বাস্তবে তিনি ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ কিংবা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের মতো কোনো বড় কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি। এই ব্যর্থতা অনেকের কাছে ভিয়েতনাম যুদ্ধের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।

অন্যদিকে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কৌশলের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। পারস্য উপসাগরের তেল শোধনাগার ধ্বংস এবং ট্যাংকার চলাচল বন্ধ করে দিয়ে তারা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইরানের তেল এবং বেলারুশের সারের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে ট্রাম্পকে বাধ্য করেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান আরব রাজতন্ত্রগুলোকেও দেখিয়ে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রসঙ্গে ট্রাম্প নিজেই এই সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, আমরা যদি কিছু করতে পারতাম, তবে ভালো হতো—কিন্তু তাদের এটি খুলতেই হবে।

নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও ইরান যুদ্ধে এই কৌশলগত ব্যর্থতা ট্রাম্পের জন্য এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সংঘাতই হয়তো তাকে নীতিগত ব্যর্থতার তালিকায় শীর্ষে নিয়ে যাবে।