অবৈধ অটোরিকশার দখলে বিদ্যুৎ: বছরে হাজার কোটি টাকার ক্ষতি, বাড়ছে লোডশেডিংয়ের শঙ্কা

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ চাপ তৈরি করছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। নিয়ন্ত্রণহীন চার্জিং ও অবৈধ সংযোগের কারণে জাতীয় গ্রিড থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে—যার মাশুল গুনছে পুরো অর্থনীতি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশই চলে যাচ্ছে অবৈধ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে। প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে শুধুমাত্র এই খাতে, যার বড় অংশই অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে নেওয়া। এতে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি (Bangladesh Jatri Kalyan Samity) বলছে, বর্তমানে সারা দেশে ৬০ লাখেরও বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। শুধু রাজধানীতেই রয়েছে ১২ থেকে ১৫ লাখ। প্রতিটি রিকশায় ৪ থেকে ৬টি ১২ ভোল্ট ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়, যা পূর্ণ চার্জ হতে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় নেয়।

প্রতিটি অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে দিনে ৬ থেকে ৮ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ফলে শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। এই চাহিদা মেটাতে সরকারিভাবে ৩ হাজার ৩০০ চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তবে এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট গড়ে উঠেছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (Dhaka Metropolitan Police)-এর তথ্যমতে, রাজধানীতে প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ও ৯৯২টি গ্যারেজ রয়েছে। এসব স্থানে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১৫০টি রিকশার ব্যাটারি চার্জ করা হয়।

মিরপুর, ওয়ারী, গুলশান, উত্তরা, মতিঝিল, লালবাগ, তেজগাঁও ও রমনা—প্রায় সব ডিভিশনেই ছড়িয়ে পড়েছে এই অবৈধ চার্জিং নেটওয়ার্ক। অনেক ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে হুকিং করে সরাসরি লাইন টেনে দিন-রাত চলছে চার্জিং কার্যক্রম।

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI)-এর মূল সড়কের দুই পাশের ফুটপাথ জুড়ে দেখা যায় এমন চিত্র। সেখানেই শত শত রিকশার ব্যাটারি অবৈধভাবে চার্জ করা হচ্ছে।

এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, বৈধ মিটার নিতে বিপুল খরচ হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে অবৈধ পথে হাঁটছেন। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত অভিযান হলেও কিছুদিন পর আবার একই কার্যক্রম শুরু হয়।

রিকশা মালিক ও চালকরাও একই বাস্তবতার কথা বলছেন। প্রতিদিন নতুন নতুন অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে রাজধানীর সড়কে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য অটোরিকশা তৈরির কারখানা। ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় একটি রিকশা কিনে সহজেই রাস্তায় নামা যায়—চার্জিংয়ের ব্যবস্থাও পাওয়া যায় টাকার বিনিময়ে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET)-এর পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ঢাকায় দৈনিক প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে যদি ৫০০ থেকে ৭০০ মেগাওয়াট অটোরিকশায় ব্যয় হয়, তাহলে গ্রীষ্মে লোডশেডিং অনিবার্য হয়ে উঠবে। পাশাপাশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্টগুলো জাতীয় গ্রিডের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ আরও কঠোর ভাষায় বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন রাজধানীর জন্য “ক্যান্সারে” পরিণত হয়েছে। দ্রুত নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তিনি অবৈধ কারখানা, চার্জিং স্টেশন এবং ব্যাটারি আমদানি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

অন্যদিকে রাজধানীর বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (DPDC)-এর নির্বাহী পরিচালক মো. রবিউল হাসান বলেন, বৈধ সংযোগ না দিলে তারা অবৈধভাবে বিদ্যুৎ নেয়—এই বাস্তবতা থেকেই কিছু বৈধ চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং পুরনো লাইনের পরিবর্তে অ্যারিয়াল ক্যাবল স্থাপন করা হচ্ছে, যাতে হুকিং বন্ধ করা যায়।

তবুও বাস্তবতা বলছে—নিয়ন্ত্রণহীন এই খাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে বিদ্যুৎ সংকট, লোডশেডিং এবং আর্থিক ক্ষতির বোঝা আরও বাড়বে।