যুক্তরাষ্ট্রে ২৫তম সংশোধনী ঘিরে জল্পনা তীব্র, ট্রাম্পকে অপসারণের সম্ভাবনা নিয়ে বাড়ছে বাজারের বাজি

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে—এমন সম্ভাবনা ঘিরে প্রেডিকশন মার্কেটগুলোতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক সপ্তাহান্তে এই সম্ভাবনার ওপর বাজির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা বিশ্লেষকদের মতে কেবল বাজারের প্রবণতা নয়, বরং বর্তমান রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন। বিষয়টি সামনে এনেছে নিউজউইক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রিত প্রেডিকশন প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘কালশি’-তে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। ব্যবহারকারীরা সক্রিয়ভাবে বাজি ধরছেন—প্রেসিডেন্টকে দাপ্তরিকভাবে অযোগ্য ঘোষণা করার মতো কোনো পদক্ষেপ মন্ত্রিসভা গ্রহণ করতে পারে কি না।

এই অস্বাভাবিক উত্থান এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইরান যুদ্ধ নতুন মাত্রা পেয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াও সমালোচনার মুখে পড়েছে।

কেন এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে গেলে ২৫তম সংশোধনীর ক্ষমতা ও প্রভাব বিবেচনায় নিতে হয়। এটি এমন একটি সাংবিধানিক বিধান, যা ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রিসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যকে একজন প্রেসিডেন্টকে দায়িত্ব পালনে অক্ষম ঘোষণা করার সুযোগ দেয়। অর্থাৎ, এটি কার্যত নির্বাহী ক্ষমতার একটি জরুরি ‘চেক’ হিসেবে কাজ করে।

প্রেডিকশন মার্কেটের এই ওঠানামা অনেক সময় বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতির চেয়ে বেশি কিছু নির্দেশ করে। এটি বিনিয়োগকারীদের মনোভাব, জনমতের দোলাচল এবং সরকারের স্থিতিশীলতা নিয়ে মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে। যদিও এসব বাজার নির্ভুল পূর্বাভাস দেয় না, তবুও তাৎক্ষণিক প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তার সূচক হিসেবে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

কালশির একটি নির্দিষ্ট চুক্তি—“ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সময় কি ২৫তম সংশোধনী ব্যবহার করা হবে?”—নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এখানে অংশগ্রহণকারীরা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—এই দুই ধরনের শেয়ার কিনে নিজেদের অবস্থান জানাতে পারেন।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ‘হ্যাঁ’ পক্ষের শেয়ারের মূল্য গত এক মাসে ২৮.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫.১ শতাংশে পৌঁছেছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থান। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই হার ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ।

এই হঠাৎ পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একাধিক বিতর্কিত ঘটনা। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সেখানে তিনি এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যা বিশ্লেষকদের মতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে এবং উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে।

তার ওই পোস্টে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার ইঙ্গিত এবং বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুমকির মতো বক্তব্যও ছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই প্রেক্ষাপটে কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি প্রকাশ্যে মন্ত্রিসভাকে আহ্বান জানান, তারা যেন ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করেন। তিনি ট্রাম্পের মন্তব্যকে “সম্পূর্ণ, চূড়ান্তভাবে ভারসাম্যহীন” বলে বর্ণনা করেন।

তবে বাস্তবতা হলো—এই সংশোধনী এখনো পর্যন্ত কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে অপসারণের জন্য ব্যবহার করা হয়নি। সাধারণত এটি ব্যবহৃত হয়েছে এমন পরিস্থিতিতে, যখন প্রেসিডেন্ট সাময়িকভাবে অসুস্থ বা চিকিৎসাধীন থাকেন এবং দায়িত্ব অস্থায়ীভাবে হস্তান্তর করতে হয়।

এই প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রিসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রয়োজন। এরপর কংগ্রেসের সম্পৃক্ততা আসে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে এটি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং আইনি বাধারও একটি দীর্ঘ পথ।

প্রেডিকশন মার্কেট নিয়ে বিতর্কও নতুন নয়। সমালোচকরা মনে করেন, কালশির মতো প্ল্যাটফর্মগুলো জল্পনা-কল্পনাকে উসকে দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, এই বাজারগুলো অনিশ্চয়তার সময়ে জনমতের স্বচ্ছ প্রতিফলন তুলে ধরে।

আগামী দিনগুলোতে কী হতে পারে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। যতদিন এই চুক্তি খোলা থাকবে, ততদিন কালশির বাজারে লেনদেন চলবে এবং ইরান যুদ্ধসহ বৈশ্বিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে এর দাম ওঠানামা করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়তে থাকলে, প্রেডিকশন মার্কেটগুলোতেও অস্থিরতা বজায় থাকবে—যা আবার নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।