অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যেগুলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে পাসের মাধ্যমে আইনে পরিণত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার অন্যতম হচ্ছে আওয়ামী লীগ (Awami League)-এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা অধ্যাদেশ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বলপ্রয়োগ ও গণহ’\ত্যার অভিযোগে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় জারি করা ওই অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে। এখন সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, অধ্যাদেশে আগে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে কী ধরনের শাস্তি হবে তা স্পষ্ট ছিল না। তবে নতুন আইনে এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে যুক্ত করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বিদ্যমান শাস্তির কাঠামো অনুসরণ করা হতে পারে। সেই আইনে বলা আছে, নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করলে চার থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
অধ্যাদেশটিকে বিল আকারে পাস করার প্রস্তাবে সাজার বিধান অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে সংশ্লিষ্ট কমিটি। এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতও গ্রহণ করা হয়েছে এবং মন্ত্রণালয় অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তরের পক্ষে মত দিয়েছে। একইসঙ্গে শাস্তির বিধান সংযুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছে তারা।
নিষিদ্ধ সংগঠনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইনের ১৬ ধারায় যেসব শাস্তির বিধান রয়েছে, সেগুলোই নতুন আইনে যুক্ত হতে পারে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (Salahuddin Ahmed) জানিয়েছেন, “অধ্যাদেশটি কিছু সংশোধনীসহ পাসের সুপারিশ করা হয়েছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ গত ১৩ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে উপস্থাপন করা হয়। সেদিনই গঠিত ১৪ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করে সংসদে রিপোর্ট আকারে পেশ করে। গত বৃহস্পতিবার কমিটি ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত রেখে আইনে পরিণত করার সুপারিশ করে। পাশাপাশি ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আকারে উপস্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়, ১৬টি এখনই উত্থাপন না করার এবং চারটি রহিত করে সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশগুলো ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে পাস না হলে কার্যকারিতা হারাবে। যে ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল হিসেবে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ২০২৫ সালের ১১ মে জারি করা ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ’। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমেই ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ ও ২০ ধারা সংশোধন করে আওয়ামী লীগ এবং এর সব সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
একই আইনের আওতায় ২০২৪ সালের অক্টোবরে ছাত্রলীগকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ওই সময় যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকে এই সংশোধনী আনা হয়, যেখানে বলা হয়—কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে নির্বাহী আদেশে সরকার তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে পারবে। একই দিনে জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা এই অধ্যাদেশটি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, এখানে নতুন কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিদ্যমান প্রক্রিয়াকেই অনুসরণ করা হচ্ছে।
পুরো প্রক্রিয়াটি এখন সংসদীয় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যা দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।


