মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় জ্বালানি-খাদ্য ঝুঁকি, বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতির চাপ—সতর্ক করল বাংলাদেশ ব্যাংক

ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank)। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের বৈদেশিক ভারসাম্য ও অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

মঙ্গলবার (৮ এপ্রিল) প্রকাশিত অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়কালের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেব্রুয়ারির শেষে দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকার বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।

এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে জ্বালানি খাতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এসেছে বাজার ব্যবস্থাপনায়। সরকার নির্ধারিত মূল্যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রির জন্য সব পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (LOAB)। বুধবার (৮ এপ্রিল) সংগঠনটির পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় (Ministry of Commerce) জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসকদের অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি বন্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ গণমাধ্যমে উঠে আসার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

লোয়াব জানায়, এলপিজি বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার নির্ধারিত মূল্যেই সিলিন্ডার সরবরাহ করছে। এর পরও অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর অবস্থান নিতে বলা হয়েছে।

অর্থনীতির ভেতরের চিত্রও খুব আশাব্যঞ্জক নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর বাড়তি নির্ভরতা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি আরও কঠিন করে তুলছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা পরিবেশের জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা, উচ্চ ঋণব্যয় এবং নিয়ন্ত্রক বাধার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে গেছে, যা তরুণ শ্রমবাজারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

রাজস্ব খাতেও দুর্বলতা স্পষ্ট। কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় সরকারের উন্নয়ন ব্যয় চাপের মুখে পড়েছে। প্রত্যাশার তুলনায় কম রাজস্ব আদায়ের ফলে বাজেট বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণের প্রয়োজনীয়তা সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে আর্থিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে।

এ ছাড়া বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে। এতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি ও প্রবাস আয় হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপের আশঙ্কা রয়েছে।

তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথও দেখিয়েছে বিশ্বব্যাংক (World Bank)। সংস্থাটি বলছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর সংস্কার, ব্যাংক খাতের দ্রুত সংস্কার এবং ব্যবসা পরিবেশ সহজ করা জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের মতে, নীতিগত স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ত্বরান্বিত হবে। অন্যথায় প্রয়োজনীয় সংস্কার বিলম্বিত হলে প্রবৃদ্ধি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং দারিদ্র্যের চাপ বাড়তে পারে।

এদিকে বাজারে স্বর্ণের দামও বেড়েছে। নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার ৪০৯ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪০ হাজার ৯২০ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৬ হাজার ৫১১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৯৫ টাকা।