ইসলামাবাদে ঐতিহাসিক বৈঠকের দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সন্ধিক্ষণ

সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বৈঠকের মঞ্চ প্রস্তুত হয়েছে ইসলামাবাদ (Islamabad)-এ। মধ্যপ্রাচ্যে ছয় সপ্তাহের ভয়াবহ যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র (United States) ও ইরান (Iran)-এর শীর্ষ নেতারা মুখোমুখি আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন—যে বৈঠক অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

মাত্র তিন দিন আগে হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে শুক্রবার নির্ধারিত এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য—অস্থায়ী এই সমঝোতাকে স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে রূপ দেওয়া সম্ভব কি না, তা যাচাই করা। মধ্যপ্রাচ্যে এখনো উত্তেজনা বিরাজ করায় বিশ্বজুড়ে এই আলোচনার দিকে নিবিড় নজর রাখা হচ্ছে।

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভেন্স (JD Vance)। তার সঙ্গে থাকবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টেভ উইটকফ এবং জারেড কুশনার।

অন্যদিকে ইরানের পক্ষের নেতৃত্ব দেবেন পার্লামেন্ট স্পিকার মুহাম্মদ বাকের কালিবফ (Mohammad Bagher Ghalibaf)। তার সঙ্গে থাকবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। এই উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতি বৈঠকের গুরুত্ব ও জরুরিতা স্পষ্ট করে তুলছে।

বৈঠককে ঘিরে ইসলামাবাদে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী এবং বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকটি একটি গোপন ও সুরক্ষিত স্থানে অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার থাকবে না।

এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘পাকিস্তান এখানে আয়োজক ও মধ্যস্থতাকারী। এটি কোনো প্রদর্শনী নয়—লক্ষ্য হলো বাস্তব ফলাফল।’ পাকিস্তান পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, তারা স্বীকৃতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে দীর্ঘদিনের বৈরী দুই পক্ষের মধ্যে কার্যকর সংলাপের পথ তৈরি করতে।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, প্রথমে দুই পক্ষ পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করবে। এরপর ইসলামাবাদ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রস্তাব ও বার্তা আদান-প্রদানের ভূমিকা পালন করবে। যদিও সরাসরি মুখোমুখি আলোচনার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।

আলোচনার মূল ইস্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ, হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz)-এর নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ১৫ দফা এবং ইরান ১০ দফা প্রস্তাব নিয়ে বৈঠকে অংশ নিচ্ছে। ইরানের প্রস্তাবে ভবিষ্যতে সামরিক হামলা না করার নিশ্চয়তা এবং অঞ্চলে মার্কিন সেনা উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমানোর বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

যদিও কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে, তবুও যুদ্ধবিরতি এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। বৈঠকের আগে শেহবাহ শরিফ (Shehbaz Sharif) এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সব পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, এক পর্যায়ে ইসরাইলের হামলার কারণে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। তখন পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করে ইরানকে সংযত থাকতে রাজি করায় এবং বড় সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়।

এই ভূমিকায় বৈশ্বিক সংকটের সময় পাকিস্তান নিজেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিক বড় কোনো সমাধান নাও আসতে পারে।

এক কূটনীতিকের ভাষায়, ‘এটি কোনো একদিনের ঘটনা নয়, বরং একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। পারস্পরিক অবিশ্বাস, জটিল ইস্যু এবং বহু পক্ষ জড়িত থাকায় অগ্রগতি সম্ভব হলেও তা নিশ্চিত নয়।’

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদের এই আলোচনা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ উন্মুক্ত হতে পারে। আর ব্যর্থ হলে অঞ্চলটি আবারও বড় ধরনের সংঘাতের মুখে পড়তে পারে।