দেশের তৈরি পোশাক খাতে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (DCCI))–এর সভাপতি তাসকীন আহমেদ (তাসকীন আহমেদ)। একই সঙ্গে সিমেন্ট শিল্পেও উৎপাদন ব্যয় প্রতি ব্যাগে ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজধানীর মতিঝিল (মতিঝিল)–এ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) আয়োজিত ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং মোকাবিলায় কর্মপন্থা নির্ধারণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি জানান, পরিবহন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। কনটেইনার ফ্রেইট চার্জ ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় প্রতি কনটেইনারে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে।
ঢাকা চেম্বারের তথ্যমতে, স্টিল ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতেও কাঁচামাল ও লজিস্টিক ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। স্টিল স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি ৭০ থেকে ৯০ ডলার এবং ওষুধ উৎপাদনের উপকরণের ব্যয় ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে।
অন্যদিকে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৯০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ৪৫ শতাংশ এসএমই উদ্যোক্তা জ্বালানি সংকটকেই তাদের প্রধান ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করে তাসকীন আহমেদ বলেন, গ্রামীণ এলাকায় প্রতিদিন তীব্র লোডশেডিং পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শহরে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী তাদের মোট আয়ের প্রায় ২২ শতাংশ কেবল জ্বালানি খাতে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। কৃষি খাতে ডিজেল আমদানির দাম ১৭.৬৫ শতাংশ এবং সার আমদানির ব্যয় প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও কার্যকর কোল্ড চেইনের অভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ উৎপাদিত ফসল ও সবজি সংগ্রহের পর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকটের মধ্যেই চলমান আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের শিল্প খাতকে বহুমুখী চাপে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর কেবল বৈদেশিক ইস্যু নয়, এটি সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।
ঢাকা চেম্বার মনে করে, দ্রুত সংকট মোকাবিলায় জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের মতো দেশ থেকে জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ জরুরি। পাশাপাশি ৯০ থেকে ১৮০ দিনের ডিফার্ড পেমেন্ট সুবিধা নিশ্চিত করা, দিনের আলো সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং এসি ব্যবহারের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নির্ধারণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিকল্পিত লোডশেডিং, ক্যাপাসিটি চার্জ পুনর্বিবেচনায় ফোর্স মেজিউর প্রয়োগ এবং স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাও বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়। কৃষি খাতে সার ও ডিজেলে ভর্তুকি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
এছাড়া রপ্তানিমুখী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া এবং শিল্প খাতে এনার্জি ইনসেনটিভ প্রদানের সুপারিশ উঠে আসে।
স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে শুল্ক হ্রাস, ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, নিয়মিত এনার্জি অডিট এবং সিস্টেম লস কমাতে তিতাস ও বাখরাবাদের পুরোনো পাইপলাইন সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পায়রা ও মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া এবং নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ ত্বরান্বিত করার সুপারিশ করা হয়।
জাতীয় জ্বালানি মজুত বাড়াতে তৃতীয় এফএসআরইউ ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC))–এর সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান এবং এফবিসিসিআই (এফবিসিসিআই (FBCCI))–এর প্রশাসক মো. আব্দুর রহিম খানসহ অন্যান্য অতিথিরা।
