এডিবির পূর্বাভাস: চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে ৪% প্রবৃদ্ধির পথে বাংলাদেশ

বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মাঝেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (Asian Development Bank – ADB)। সংস্থাটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪.০ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।

শুক্রবার প্রকাশিত এডিবির ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও)’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থবছরে ৪.০ শতাংশ এবং আগামী অর্থবছরে ৪.৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভোগব্যয় ও বিনিয়োগের ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার এই প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সাধারণ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমে আসায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত সরবরাহ শৃঙ্খলের সাময়িক বিঘ্ন গত ত্রৈমাসিকে অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছিল, তবে এর প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জিয়ং (Hoe Yun Jeong) বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বহির্বাণিজ্য ও আর্থিক খাতের চাপ একসঙ্গে প্রভাব ফেলছে।

তিনি আরও বলেন, নতুন সরকারের সংস্কার উদ্যোগ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার, বেসরকারি খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। সঠিক নীতি ও ধারাবাহিক সংস্কার বজায় থাকলে অর্থনীতি আরও স্থিতিস্থাপক হয়ে উঠবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯.০ শতাংশে অবস্থান করতে পারে, যা তুলনামূলকভাবে উচ্চ। এর পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি দামের চাপ এবং চলমান সরবরাহ বিঘ্ন। তবে আগামী অর্থবছরে এটি কিছুটা কমে ৮.৫ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ বাহ্যিক চাপ কমবে এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

চলতি হিসাবের ঘাটতি চলতি অর্থবছরে জিডিপির ০.৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে, যা আগামী অর্থবছরে বেড়ে ০.৬ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। আমদানি বৃদ্ধি ও বাণিজ্য ঘাটতির প্রসার এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করছে এডিবি।

এডিওতে আরও বলা হয়েছে, ভোগ ও বিনিয়োগে মাঝারি প্রবৃদ্ধি বজায় থাকবে, যা শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং নির্বাচন-পরবর্তী সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে সমর্থন পাবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া উদ্যোগও এতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

সরবরাহ দিক থেকে সেবা খাতের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে, যা গৃহস্থালির ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় বাড়ানো এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের মাধ্যমে ত্বরান্বিত হতে পারে। অনুকূল আবহাওয়া ও নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে কৃষি খাতও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। একই সঙ্গে রপ্তানি বৃদ্ধি, সরবরাহ বাধা কমে আসা এবং অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে জোর দেওয়ার ফলে শিল্প খাতেও প্রবৃদ্ধি বাড়বে।

তবে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। বিশেষ করে যদি বৈশ্বিক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে জ্বালানি বাজার, শিপিং রুট এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন করে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। এতে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়বে, যা দেশের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণকে জটিল করে তুলতে পারে।