পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনায় স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের পথ না খুঁজে পাওয়ার পর আবারও সামরিক পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (The Wall Street Journal) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি ইরানে পুনরায় বিমান হামলা চালানোর বিষয়টিও তার সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল দশটা থেকে ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ কার্যকর করা হবে—যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বও কড়া অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ (Mohammad Bagher Ghalibaf) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে তেহরান কোনোভাবেই ‘নতি স্বীকার’ করবে না।
একইসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি (Abbas Araghchi) তুলে ধরেছেন ভেঙে যাওয়া আলোচনার পেছনের বাস্তবতা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনায় দুই পক্ষই একটি চুক্তির ‘একদম কাছাকাছি’ পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চ চাপ’, বারবার লক্ষ্য পরিবর্তন এবং অবরোধের কৌশল সেই সম্ভাবনাকে ভেঙে দেয়।
গালিবফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে বিদ্রূপ করে বলেন, বর্তমান তেলের দাম উপভোগ করার আহ্বান জানিয়ে শিগগিরই কম দামের জ্বালানির দিনগুলোর স্মৃতি মনে করতে হবে—এমন ইঙ্গিত দেন তিনি।
অন্যদিকে, ইরানের নৌবাহিনীও সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাদের দাবি, দেশের জলসীমার দিকে এগিয়ে আসা যেকোনো সামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে ‘কঠোর’ ব্যবস্থা নেওয়া হবে—যা সম্ভাব্য সংঘাতকে আরও বিস্তৃত রূপ দিতে পারে।
যুদ্ধের ছায়ায় ডিজিটাল অন্ধকার
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। সাইবার হামলার ঝুঁকি ঠেকানোর অজুহাতে ইন্টারনেট ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।
বিশেষ করে যারা অনলাইনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তারা পড়েছেন গভীর সংকটে। তথ্য আদান-প্রদানের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় দৈনন্দিন কাজকর্মও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইরানি সমাজকে কার্যত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একদিকে রয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা, সরকার-সমর্থক ব্যবহারকারী, সাংবাদিক এবং সাম্প্রতিক সময়ে কিছু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—যারা অনুমোদিত সিম কার্ড বা প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাক্সেসের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন।
অন্যদিকে রয়েছেন সাধারণ নাগরিকরা, যারা স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন—তাও চড়া মূল্যে। স্টারলিংক (Starlink) সেবার মাধ্যমে প্রতি গিগাবাইট ইন্টারনেটের জন্য প্রায় ছয় ডলার খরচ করতে হচ্ছে, যা দেশটির গড় মাসিক আয় (২০০ থেকে ৩০০ ডলার)-এর তুলনায় অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
এমনকি স্টারলিংক ব্যবহারের কারণে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের ঝুঁকিও রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শত শত স্টারলিংক ডিভাইস জব্দ করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ—যা প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রাকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।


