ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা—কৌশল, চাপ নাকি সুযোগ?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয় টানা উত্তেজনা, যার একপর্যায়ে নি’\হত হন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (Ayatollah Ali Khamenei)। পাল্টা জবাব দেয় ইরান, আর সেই সংঘাত গড়ায় দীর্ঘ ৩৮ দিনের যুদ্ধে। অবশেষে চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তান (Pakistan)-এর মধ্যস্থতায় একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুই পক্ষ।

কিন্তু এই সংকটময় মুহূর্তে পাকিস্তান কেন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় এগিয়ে এলো—এই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka)-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলী আশরাফ (Ali Ashraf) এ বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে একাধিক বাস্তব কারণ।

তিনি বলেন, পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান এখানে বড় একটি বিষয়। ইরানের সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত রয়েছে দেশটির। একইসঙ্গে সৌদি আরব (Saudi Arabia)-এর সঙ্গে পাকিস্তানের কৌশলগত ও সামরিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ফলে ইরান যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি পাকিস্তানের অর্থনীতিতে পড়েছে—বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে।

অধ্যাপক আশরাফের ভাষায়, এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসা পাকিস্তানের জন্য জরুরি ছিল। অন্য অনেক দেশের তুলনায় এই সংকটের চাপ পাকিস্তান বেশি অনুভব করেছে বলেই তাদের আগ্রহও বেশি ছিল।

দ্বিতীয়ত, তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের সামরিক হামলায় সৌদি আরব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইসলামাবাদের ওপর চাপ তৈরি হয়। সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তির কারণে পাকিস্তানকে সেই সম্পর্কের বাস্তবতা মাথায় রেখে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।

তবে এই পুরো পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য সহজ ছিল না। অধ্যাপক আশরাফ মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি শক্তি প্রয়োগ পাকিস্তানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতো, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা রয়েছে। তাই তারা এই সংকটকে ভিন্নভাবে দেখেছে—নিজেদেরকে একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-এর সঙ্গে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সম্পর্ক উন্নত হয়েছে। ইসলামাবাদ এই সম্পর্ককেও কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে চেয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

অধ্যাপক আশরাফের বিশ্লেষণে আরও উঠে আসে, এই মধ্যস্থতার পেছনে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে উল্লেখযোগ্য শিয়া জনগোষ্ঠী রয়েছে, যা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ককে সংবেদনশীল করে তোলে। একইসঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কও একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে।

তার মতে, সৌদি আরব নিজে সরাসরি মধ্যস্থতায় আসতে পারেনি, কারণ ইরানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা রয়েছে। সেই জায়গা থেকে পাকিস্তানকে সামনে আনা হয়েছে একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে।

সব মিলিয়ে, এই যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়—অর্থনীতি, কূটনীতি ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। অধ্যাপক আশরাফ মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের জন্যই ইতিবাচক নয়—না বাণিজ্যের জন্য, না শান্তির জন্য।