ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (Brahmanbaria-2) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও রুমিন ফারহানা (Rumeen Farhana) সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ না নেওয়ার কারণ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। বিএনপি (BNP)-র সাবেক এই নেত্রী বলছেন, তিনি প্রথমবার যে শপথ নিয়েছেন, সেটি বর্তমান সংবিধানের অধীনেই নিয়েছেন। সেই বাস্তবতায় একই সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয়বার শপথ নেওয়া তার কাছে আইনগতভাবে সাংঘর্ষিক, এমনকি অযৌক্তিকও।
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, জার্মানিভিত্তিক গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলে (Deutsche Welle)-র বাংলা টক শোতে অংশ নিয়ে তিনি এ অবস্থান স্পষ্ট করেন।
আলোচনায় রুমিন ফারহানা বলেন, তার মূল যুক্তি ছিল একেবারেই কাঠামোগত। তার ভাষ্যে, রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত যে পথে এগিয়েছে, তা বর্তমান সংবিধানের ভিত্তিতেই। ৫ আগস্টের পর যদি শুরুতেই সরকার স্পষ্ট করে বলত যে এটি একটি বিপ্লবী সরকার, তারা বিদ্যমান সংবিধান মানছে না, সেটিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নতুন সংবিধান রচনা করবে, তাহলে অন্তত দ্বিতীয় শপথ নেওয়ার জন্য একটি আলাদা আইনগত কাঠামো তৈরি করা যেত। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
তিনি বলেন, যেহেতু সেই পথ নেওয়া হয়নি, বরং বর্তমান কার্যকর সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনেই শপথ গ্রহণ করা হয়েছে এবং গত দেড় বছরের বৈধতাও সেই ১০৬ অনুচ্ছেদ দিয়েই নির্ধারণ করা হয়েছে, তাহলে সেই একই সংবিধানের বাইরে গিয়ে আবার নতুন করে দ্বিতীয় শপথ নেওয়ার কোনো সুযোগ আর থাকে না।
রুমিন ফারহানার ভাষায়, তিনিও বিষয়টি সেভাবেই দেখেছেন। যেহেতু প্রথম শপথ তিনি বিদ্যমান সংবিধানের অধীনে নিয়েছেন, তাই দ্বিতীয় শপথ তার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তার মতে, এখানে শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, মৌলিক প্রশ্নটি আইনগত সামঞ্জস্যের।
দ্বিতীয়বার শপথ নেওয়া হলে প্রথম শপথের গুরুত্ব কার্যত নষ্ট হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রুমিন ফারহানা বলেন, দ্বিতীয় শপথ নিলে প্রথমবার যে শপথ নেওয়া হয়েছে, সেটি নালিফাই হয়ে যায়। এটাই ছিল তার যুক্তি। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বিষয়টি ঘিরে যে বিতর্ক ও আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ এর সঙ্গে আরও নানা সাংবিধানিক ও আইনগত দিক জড়িয়ে আছে।
তিনি বলেন, প্রথমত ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শপথ নেওয়ার যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত যা কিছু ঘটছে, সেগুলো নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন। তার দাবি, শুরুতেই ১০৬ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ যথাযথভাবে করা হয়নি। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, যেসব বিচারক এ প্রক্রিয়া নিয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তারাও পরে পদত্যাগ করেছেন। কেউ বলছেন, তাদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে; আবার কেউ বলছেন, তারা স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাও দায়িত্ব ছেড়ে চলে গেছেন।
তার মতে, এখন যে নতুন আলোচনা সামনে আসছে, তা কেবল দ্বিতীয় শপথের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো প্রক্রিয়াটিকেই বিতর্কের মুখে তোলার সুযোগ তৈরি করছে। অন্তর্বর্তী সরকার যে উপায়ে গঠন করা হয়েছিল, সেটি আদৌ সংবিধানসম্মত ও যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়েছে কি না—এই প্রশ্নও সামনে আসে বলেই তিনি মনে করেন।
ভবিষ্যতে এ নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনার কথাও উড়িয়ে দেননি রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, কেউ যদি এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চায়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তোলা সম্ভব হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি আইনি বিচারধারার একটি প্রতিষ্ঠিত নীতির কথাও মনে করিয়ে দেন—যা ঘটে গেছে, তাকে ঘটিত বাস্তবতা হিসেবেই দেখতে হয়। তার ভাষায়, সময়কে পেছনে নিয়ে গিয়ে সেই পরিস্থিতি বদলে দেওয়া যায় না।
এই প্রসঙ্গে তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, আজ থেকে ১০ বছর পর যদি কেউ এ বিষয়টি চ্যালেঞ্জও করে, তাহলেও তো ১০ বছর আগের বাস্তবতায় ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। ফলে যা হয়ে গেছে, সেটিকে এক অর্থে মেনে নিয়েই এগোতে হবে। যদিও তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আইনগত সততা ও কাঠামোগত বৈধতার প্রশ্নে গেলে প্রতিটি স্তরেই চ্যালেঞ্জ তোলার যথেষ্ট সুযোগ রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে, রুমিন ফারহানার বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে—তার আপত্তি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক শপথে নয়, বরং সেই শপথের পেছনের সাংবিধানিক ভিত্তি, রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা এবং আইনগত সঙ্গতির প্রশ্নে। আর সেখানেই তিনি দ্বিতীয়বার শপথ গ্রহণ থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন।


