শেয়ারবাজার কি ‘ভাগাড়ে’ পরিণত? জাঙ্ক কোম্পানির দৌরাত্ম্যে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকটে

‘ভাগাড়’ বলতে সাধারণত এমন একটি স্থানকে বোঝায়, যেখানে মৃত পশু, আবর্জনা বা পচনশীল বর্জ্য ফেলা হয়। দেশের শেয়ারবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে অনেকেই বলছেন, এটি এখন অনেকটাই ‘আবর্জনাতুল্য বর্জ্য কোম্পানির’ ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE)-এর তথ্য বলছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় ২৯ শতাংশই এখন ‘জেড’ ক্যাটাগরিভুক্ত— যা মূলত জাঙ্ক কোম্পানি হিসেবে বিবেচিত। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ কোম্পানির উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ‘জেড’ ক্যাটাগরির প্রায় ২৮ শতাংশ কোম্পানির অস্তিত্ব নিয়েও রয়েছে সংশয়। অথচ উৎপাদন বন্ধ বা অস্তিত্ব সংকটে থাকা সত্ত্বেও এসব কোম্পানির শেয়ার লেনদেন থেমে নেই। বরং দরবৃদ্ধি ও লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে তারাই।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, একসময় ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানিগুলো ছিল বিনিয়োগের নিরাপদ খাত। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বৃত্তায়নের কারণে এখন এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকই রুগ্ণ হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ ব্যাংকের শেয়ারের দাম নেমে এসেছে অভিহিত মূল্যের নিচে। ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের লেনদেন স্থগিত রয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকবহির্ভূত আটটি প্রতিষ্ঠান ক্রমাগত লোকসানে পড়ে অবসায়নের পথে। তালিকাভুক্ত ৩৬টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩২টির বাজারদরও অভিহিত মূল্যের নিচে। ফলে হাতে গোনা কয়েকটি বহুজাতিক ও কিছু দেশীয় কোম্পানি ছাড়া বিনিয়োগযোগ্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখন অত্যন্ত সীমিত।

দুই বছরে নতুন আইপিও নেই— নজিরবিহীন স্থবিরতা
গত দুই বছরে শেয়ারবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। বিধিমালা সংশোধন সংক্রান্ত জটিলতায় আইপিও আবেদনও জমা পড়েনি। করোনাকাল ছাড়া এত দীর্ঘ সময় আইপিও না আসার ঘটনা নজিরবিহীন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দ্রুত মানসম্মত কোম্পানি বাজারে না আনলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। বিশেষ করে সরকারি মালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানি এবং বড় প্রকল্পগুলোকে সিকিউরিটাইজ করে শেয়ারবাজারে আনার সুপারিশও করা হচ্ছে।

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মেইন বোর্ডে ৩৭০টি কোম্পানি, ৩৩টি মিউচুয়াল ফান্ড, ২৩২টি ট্রেজারি বন্ড, ৪৭টি করপোরেট বন্ড এবং এসএমই বোর্ডে ৩০টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে।

জেড ক্যাটাগরির বিস্তার ও অস্বাভাবিক লেনদেন
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ৩৭০টি কোম্পানির মধ্যে ১০৭টি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। নিয়মিত এজিএম না করা, ছয় মাসের বেশি উৎপাদন বন্ধ রাখা কিংবা বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে এসব কোম্পানি এই তালিকায় পড়ে। বিনিয়োগ বিশ্লেষকদের মতে, এগুলোই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার।

এই ১০৭টির মধ্যে ৩২টি কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ— কিছু ক্ষেত্রে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে। উদাহরণ হিসেবে, মেঘনা পিইটি ২০০২ সাল থেকে বন্ধ থাকলেও এর শেয়ার লেনদেন চলছে। বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোড ২০১৬ সালে বন্ধ হলেও এর শেয়ারের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। দুলামিয়া কটন, রহিমা ফুড, শ্যামপুর সুগার মিলসের মতো বন্ধ কোম্পানির শেয়ার ১০০ টাকার ওপরে লেনদেন হচ্ছে, যেখানে ভালো মানের ‘এ’ ক্যাটাগরির অনেক ব্যাংকের শেয়ার ৪০ টাকার নিচে।

ডিএসই ইতোমধ্যে ৩০টি কোম্পানির অস্তিত্ব নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে, কিন্তু তাতেও লেনদেনে ভাটা পড়েনি।

আইপিওর শর্ত বনাম বাস্তবতা
নিয়ম অনুযায়ী, লোকসানি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ নেই। টানা তিন বছর মুনাফা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তালিকাভুক্তির কয়েক বছরের মধ্যেই অনেক কোম্পানি লোকসানে পড়ে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে যাচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য: “জুয়া ছাড়া কিছু নয়”
শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, বাজারে এখন ‘গার্বেজ’ কোম্পানির আধিক্য। এসব শেয়ারে বিনিয়োগ অনেকটা জুয়ার মতো। আগে ৯০ শতাংশ লেনদেন জাঙ্ক শেয়ারে হতো, এখনো প্রায় ৫০ শতাংশ লেনদেন এসব শেয়ারে হচ্ছে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রায় ৪০০ কোম্পানির মধ্যে মাত্র ৪০-৫০টি বিনিয়োগযোগ্য। অধিকাংশই জাঙ্কে পরিণত হয়েছে। তিনি পরামর্শ দেন, পচা আপেলের মতো এসব কোম্পানিকে বাজার থেকে সরিয়ে ভালো কোম্পানি আনতে হবে।

বিনিয়োগকারীদের প্রস্থান ও আস্থার সংকট
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিও অ্যাকাউন্ট ১৬ লাখ ৫৭ হাজার, যেখানে ২০১০ সালে ছিল ৩৩ লাখের বেশি। অর্থাৎ ১৪ বছরে অর্ধেক বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়েছেন।

নিয়ন্ত্রকদের ভূমিকা ও বিতর্ক
২০০৮ সালের পর বাজারে কৃত্রিম উত্থান এবং ২০১০ সালের ধসের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক খায়রুল হোসেন ও অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের সময়ে বিপুলসংখ্যক দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে অনিয়মের অভিযোগে শিবলী রুবাইয়াতের ওপর শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমে আজীবন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভীর ভাষায়, “কোম্পানি ভালো না হলে বাজার ভালো হবে না— সেটা ফেরেশতা দিয়েও চালানো সম্ভব নয়।” তিনি মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ইস্যুয়ার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর যোগসাজশেই দুর্বল কোম্পানিগুলো বাজারে এসেছে।

অন্যদিকে সাবেক কমিশনার হেলাল উদ্দিন নিজামী বলেন, আইপিও অনুমোদনের সময় নিয়ম মানা হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে তদারকির ঘাটতি থাকলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দেশের শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানো কঠিন হবে। না হলে জাঙ্ক কোম্পানির আধিপত্যে এটি আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হতে পারে।