আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরকে সামনে রেখে ব্যক্তিখাতে করমুক্ত আয়ের ন্যূনতম সীমা ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (Dhaka Chamber of Commerce and Industry – DCCI)। একই সঙ্গে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার বর্তমান ২৭.৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। এছাড়া রাজস্ব কাঠামোয় অটোমেশন, বাণিজ্যিক আমদানিতে আগাম কর ৭.৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা এবং কাস্টমস রিফান্ড ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (National Board of Revenue – NBR)-এ অনুষ্ঠিত প্রাক্-বাজেট আলোচনায় এসব প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। প্রস্তাবনা উপস্থাপনার শুরুতেই ঢাকা চেম্বারের কাস্টমস ভ্যাট স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক এম বি এম লুৎফুল হাদি বলেন, করজাল সম্প্রসারণ, রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা—এ বছর ডিসিসিআইয়ের মূল অগ্রাধিকার। তার মতে, করের বোঝা কমানো এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে সহায়তা দিলে একদিকে যেমন উদ্যোক্তাদের ব্যয় কমবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আহরণও বাড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এনবিআরের সম্মেলনকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) এবং আমদানি শুল্ক খাতে মোট ৫৪টি প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়। ডিসিসিআইয়ের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ড. এ কে এম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী এসব প্রস্তাবনা তুলে দেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান (Md. Abdur Rahman Khan)-এর কাছে। এ সময় ডিসিসিআইর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ সংগঠনের অন্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে ড. আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী করজাল সম্প্রসারণ ও রাজস্ব ঘাটতি কমাতে সরকারি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে ডেটা সমন্বয়ের মাধ্যমে সেন্ট্রাল এপিআই ইন্টিগ্রেশন চালুর ওপর জোর দেন। পাশাপাশি কোম্পানির আমানতের ওপর উৎসে সুদের হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং কোম্পানির নিট সম্পদের ওপর আরোপিত সারচার্জ ধাপে ধাপে বিলোপের প্রস্তাব করেন। ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি আনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বাড়াতে ভ্যাট রিফান্ডের ঊর্ধ্বসীমা বাতিল, ভ্যাট সংগ্রহ বৃদ্ধিতে মোবাইল অ্যাপ চালু এবং পুরো মূসক ব্যবস্থাকে অটোমেশনের আওতায় আনার কথাও তুলে ধরা হয়।
প্রস্তাবনার প্রতিক্রিয়ায় এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, আসন্ন বাজেটে শুল্কহার কমানোর চেয়ে নন-ট্যারিফ প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। তার মতে, এতে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমবে এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে, যা দেশের ম্যাক্রো অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তিনি আরও জানান, কর ফাঁকি রোধে কঠোর অবস্থানে থাকবে সরকার। প্রকৃত করদাতাদের ওপর চাপ ও হয়রানি কমাতে যারা কর দিচ্ছেন না, তাদের শনাক্ত করে করের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণেও এনবিআর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, গত বছর ভ্যাটের থ্রেশহোল্ড ৩ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ টাকায় নামানো হয়েছে। বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখেরও কম, যা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম। এই সংখ্যা এক কোটির বেশি হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, করপোরেট করের হার পূর্বে ৫০ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে কমিয়ে বর্তমানে ২৭.৫০ শতাংশে আনা হয়েছে। একে আরও কমানোর সুযোগ সীমিত হলেও কার্যকর করহার যেন না বাড়ে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। আগামী বছর থেকে করপোরেট কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিলের ব্যবস্থা চালু হবে এবং কর ফেরতের প্রক্রিয়াও পুরোপুরি অনলাইনে নিয়ে আসার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।


