মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ প্রেক্ষাপটে ইরান (Iran)-এর ক্ষমতার ভেতরের চিত্রে নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বিবেচিত মোজতবা খামেনি (Mojtaba Khamenei) ইসরায়েলি ও মার্কিন হা’\মলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (The New York Times)-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ওই হা’\মলায় তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (Ayatollah Ali Khamenei) নি’\হত হয়েছেন। একই ঘটনায় মোজতবা প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি মারাত্মকভাবে দগ্ধ ও পঙ্গু হয়ে পড়েছেন বলে জানানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার একটি পা কৃত্রিমভাবে প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি মুখমণ্ডল ও ঠোঁট গুরুতরভাবে পুড়ে যাওয়ায় তার স্বাভাবিকভাবে কথা বলা কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্মকর্তাদের বরাতে জানানো হয়েছে, তার চেহারা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে। অনশ্রী জঙ্কোর সম্পাদনায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদলের একটি সুস্পষ্ট চিত্রও উঠে এসেছে।
মোজতবার শারীরিক অবস্থা এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে এখন দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বড় অংশই চলে গেছে আইআরজিসি (Islamic Revolutionary Guard Corps)-এর জেনারেলদের হাতে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ (Mahmoud Ahmadinejad)-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবদোলরেজা দাভারি জানিয়েছেন, মোজতবা এখন কার্যত একটি পরিচালনা পর্ষদের পরিচালকের মতো ভূমিকা পালন করছেন, যেখানে প্রকৃত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সামরিক কর্মকর্তারা।
ইসরায়েলি নজরদারি ও সম্ভাব্য হা’\মলা এড়াতে শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা সরাসরি তার সঙ্গে দেখা করাও সীমিত করে দিয়েছেন। তার চিকিৎসা তদারকি করছেন দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান (Masoud Pezeshkian), যিনি নিজেও একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শারীরিকভাবে গুরুতর আঘাত পেলেও মোজতবা মানসিকভাবে সচেতন রয়েছেন। তার একটি পায়ে ইতোমধ্যে তিনবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে এবং একটি হাত ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা ফিরে পাচ্ছে। তবে নিজেকে দুর্বল বা ভীত হিসেবে প্রকাশ না করতে তিনি কোনো মৌখিক বিবৃতি দিচ্ছেন না; বরং লিখিত নির্দেশনার মাধ্যমেই যোগাযোগ করছেন।
এই পরিস্থিতির সুযোগে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ধর্মীয় আলেমদের প্রভাব ক্রমশ কমে যাচ্ছে, বিপরীতে কট্টরপন্থী সামরিক নেতৃত্বের আধিপত্য বাড়ছে। বর্তমানে ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি সামরিক বাহিনীর দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
রেভল্যুশনারি গার্ডসের শীর্ষ নেতা আহমদ ওয়াহিদি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদ্র এখন দেশ পরিচালনায় সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকায় রয়েছেন। অন্যদিকে নির্বাচিত সরকার ও সিভিল প্রশাসন অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও তার মন্ত্রিসভাকে মূলত অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহের মতো প্রশাসনিক কাজে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। কূটনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির তুলনায় পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া সামরিক বাহিনী এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও সরাসরি আলোচনার মতো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। প্রথমবারের মতো উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলে শীর্ষ জেনারেলদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
যদিও ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বহুদিন ধরেই একাধিক ক্ষমতার কেন্দ্র ও মতপার্থক্যের ঐতিহ্য রয়েছে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জেনারেলদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান এবং মোজতবার অসুস্থতা দেশটিকে কার্যত একটি সামরিক প্রভাবাধীন কাঠামোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে ইরানের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে মোজতবা খামেনির শারীরিক সুস্থতা এবং পর্দার আড়ালে থাকা এই সামরিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর।


