গাইবান্ধার চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র যুবকদের উচ্চ বেতনের চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে বিদেশে পাঠানোর নামে ভয়ংকর প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। ভিটেমাটি, গবাদি পশু বিক্রি ও ঋণ করে লাখ লাখ টাকা তুলে দেওয়া এসব তরুণকে পাঠানো হয় কম্বোডিয়া (Cambodia)। কিন্তু সেখানে পৌঁছে প্রতিশ্রুত চাকরির বদলে তাদের পড়তে হয় অমানবিক নি’\র্যা’\তনের মুখে। অভিযোগ, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া যুবকদের দফায় দফায় চীনা নাগরিকদের পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ‘বিক্রি’ করা হয় এবং কথিত ‘ডেথ ক্যাম্পে’ নিয়ে গিয়ে জোর করে ‘সাইবার ক্রীতদাস’ হিসেবে কাজ করানো হয়।
কালবেলার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গাইবান্ধা (Gaibandha) জেলা এনসিপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব রাহাদ ইবনে শহীদ ও তার বাবা শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিদেশে পাঠিয়ে ‘মানুষ বিক্রি’র এমন এক শক্তিশালী নেটওয়ার্কের অভিযোগ রয়েছে। অন্তত ১৫ জন ভুক্তভোগীর সন্ধান মিলেছে, যাদের মধ্যে সাতজন দেশে ফিরেছেন এবং আটজন এখনো কম্বোডিয়ায় আটকে আছেন বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, রাহাদের মাধ্যমে শুধু গাইবান্ধা থেকেই অন্তত ৩০ জন যুবককে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ায় থাকা হুসেইন কবির, তার ভাই আকাশ এবং বাংলাদেশে থাকা আরেক ভাই হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সমন্বয়ে এই মানব পাচার নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে হুমায়ুন কবিরের ‘লাইফস্টাইল স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি’ নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভিসা ও বিদেশ যাত্রার ব্যবস্থা করা হতো বলে অভিযোগ। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও সংশ্লিষ্টরাই তৈরি করতেন। এরপর কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর এসব যুবকদের বিভিন্ন স্ক্যামিং প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করে দেওয়া হতো।
প্রতারণার শুরু হতো স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে। তারা গাইবান্ধার চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র, বেকার ও স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের টার্গেট করত। পরিবারের সদস্যদের বলা হতো, বিদেশে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি, মাসে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা আয়, থাকা-খাওয়ার সুবিধা—সবই নিশ্চিত। পরিবার রাজি হলে যুবকদের নিয়ে যাওয়া হতো রাহাদ ইবনে শহীদ ও তার বাবার কাছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, গাইবান্ধা শহরের ‘বিন্দু আইটি’ নামের একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রাহাদ তাদের প্রশিক্ষণ দিতেন। সেখানে টাইপিং, ইংরেজিতে পরিচয় দেওয়া, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল মার্কেটিং শেখানো হতো। রাহাদ তাদের বলতেন, ‘ওইখানে গিয়ে তোমরা এসি রুমে থাকবা আর কম্পিউটারের কাজ করবা।’ এরপর কম্বোডিয়ায় পাঠানোর জন্য ব্যক্তিভেদে সাড়ে পাঁচ লাখ থেকে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত রাহাদ ও তার বাবার হাতে দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ।
কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে নমপেনের একটি হোটেলে আটকে রাখা হতো। এরপর ‘ট্রেনিং’য়ের নামে শেখানো হতো অনলাইন প্রতারণার কৌশল—ভুয়া অ্যাকাউন্ট, ক্লোনড ওয়েবসাইট, ক্রেডিট কার্ড থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, স্বল্প সুদে ঋণের প্রলোভন দেখিয়ে ডিপোজিট নেওয়া এবং ভয়েস-ভিডিও কল রেকর্ড করে ব্ল্যাকমেইলের মতো কাজ। কেউ এসব করতে অস্বীকৃতি জানালে চলত শারীরিক ও মানসিক নি’\র্যা’\তন, খাবার বন্ধ করে দেওয়া, মা’\রধর ও ভয়ভীতি।
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট এলাকার ১৭ বছর বয়সী শাওন দেশে ফিরে জানান, তাকে মেয়ে সেজে ভারতীয় ধনী ব্যক্তিদের টার্গেট করতে বাধ্য করা হতো। তার ভাষায়, ‘কাজ করতে না চাইলে নি’\র্যা’\তন শুরু করত। তারা কারেন্ট শক দিত, খাবার বন্ধ করে দিত।’
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের শাফিন মণ্ডলও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তার পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তাকে আটকে রাখা হয়। পরে একটি চীনা চক্রের কাছে সাড়ে চার হাজার ডলারে বিক্রি করা হয়। তিন মাস নি’\র্যা’\তনের পর তিনি আরও ২২ জনের সঙ্গে পালিয়ে আসেন।
ফুলছড়ির সাদা মিয়ার পরিবারও একই প্রতারণার অভিযোগ করেছে। তার বাবা ছকু মিয়া জানান, আটটি গরু বিক্রি ও ঋণ করে ছেলের বিদেশ যাওয়ার টাকা দেন। কিন্তু চাকরির বদলে ছেলেকে কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরে আরও টাকা দিয়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। সাদা মিয়ার অভিযোগ, দেশে ফিরে টাকা চাইতে গেলে রাহাদের বাবা লাঠি নিয়ে তার বাবাকে মা’\রতে আসেন।
একই এলাকার সৈকত, ইয়াসিন আলী, সাগর, শাওন আহমেদ, কাজল হোমেন, নাইম মিয়া, আবু হানিফ, রাশেদ, রাফি, ইউসূফ, রাহান, নিলয় মারুফ এবং দিনাজপুরের শাফিন মণ্ডলসহ আরও অনেকে এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
গত রোববার হোয়াটসঅ্যাপে কালবেলার সঙ্গে কথা হয় কম্বোডিয়ায় আটকে থাকা সাগর ও হাসান আলীর। তারা জানান, পোইপেট শহরের কাছে থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী একটি জঙ্গলে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। সাগর বলেন, ‘রাহাদের বাবাকে আমি নিজে সাড়ে ৫ লাখ টাকা গুনে দিয়ে এখানে এসেছি। আমাদের চীনা কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আমরা দেশে ফিরতে চাই।’
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের দফায় দফায় বিক্রি করা হতো। চীনা স্ক্যামিং কোম্পানিগুলো ইন্টারভিউ নিয়ে ‘মূল্য’ নির্ধারণ করত। সর্বনিম্ন ১২০০ ডলার থেকে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হতো তাদের। এই হাতবদলের কমিশন দেশে থাকা চক্রের সদস্যরাও পেতেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। তাদের অভিযোগ, রাহাদ ইবনে শহীদও সেই কমিশনের অংশ পেতেন।
গত ২ মার্চ শাফিন মণ্ডলের বাবা নূর ইসলাম বাদী হয়ে দিনাজপুরে নারী ও শিশু নি’\র্যা’\তন দমন ট্রাইব্যুনালে মানব পাচার আইনে মামলা করেন। মামলায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (National Citizen Party) বা এনসিপি (NCP) নেতা রাহাদ ইবনে শহীদ, তার বাবা শহিদুল ইসলামসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (Police Bureau of Investigation) বা পিবিআই (PBI)।
পিবিআই দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার মাহফুজ্জামান আশরাফ জানান, তদন্ত চলমান। পাসপোর্ট ও ভিসা সঠিক থাকলেও কোন এজেন্সির মাধ্যমে তারা গেছেন, তা এখনো পাওয়া যায়নি। নতুন অভিযোগগুলোর প্রমাণ মিললে তা তদন্তে এবং প্রয়োজনে চার্জশিটে সহায়ক হবে বলেও জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে রাহাদ ইবনে শহীদ বলেন, মানব পাচারের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই; তাকে জড়ানো হচ্ছে। তবে ভুক্তভোগীদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলার রুচি নেই। আপনি ভালো থাকেন ভাই।’ এরপর ফোন কেটে দেন। তার বাবা শহিদুল ইসলামও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা ব্যবসা করেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা।
এদিকে মামলার বাদী নূর আলম দাবি করেন, অভিযুক্তদের চালের ব্যবসা সংক্রান্ত বক্তব্য মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি। তবে এনসিপির যুগ্ম-মুখ্য সংগঠক সাদিয়া ফারজানা দিনা বলেন, বিষয়টি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপস্থাপন করা হবে।

