দেশের ৪১ জেলায় এইচআইভি/এইডস পরীক্ষার সুযোগ নেই, শনাক্তের বাইরে বড় অংশ

দেশের ৪১টি জেলায় এখনো এইচআইভি/এইডস পরীক্ষার সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে সংক্রমিত মানুষের একটি অংশ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। আর শনাক্ত হওয়া আক্রান্তদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী, ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী। এর বাইরে প্রবাসী ১২ শতাংশ এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ১১ শতাংশ রয়েছেন।

বুধবার রাজধানীর বিএমএ ভবনে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশন (AIDS Healthcare Foundation)–এএইচএফের সহযোগিতায় কর্মশালার আয়োজন করে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (Bangladesh Health Reporters Forum)–বিএইচআরএফ।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএইচআরএফের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিড শুভ। বিশেষ অতিথি ও মূল আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী (Saif Ullah Munshi)। এতে সভাপতিত্ব করেন বিএইচআরএফ সভাপতি প্রতীক ইজাজ। বাংলাদেশের এইডস পরিস্থিতি, সংকট ও উত্তরণ নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএইচএফের কান্ট্রি ডিরেক্টর আকতার জাহান শিল্পী (Akhtar Jahan Shilpi)। এছাড়া এইডস রিপোর্টিং, চ্যালেঞ্জ ও সমাধান নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কালবেলার স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রাশেদ রাব্বি (Rashed Rabbi)।

সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট সংক্রমিতদের প্রায় ১৮ শতাংশ এখনো শনাক্ত হয়নি। আর শনাক্তদের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ চিকিৎসার আওতার বাইরে রয়েছেন। এমন বাস্তবতায় দেশে বিশেষ করে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, রোগ নিয়ন্ত্রণে এটি এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কর্মশালায় জানানো হয়, ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এরপর প্রতিবছর ১০, ২০, ১০০ কিংবা ২০০ জন করে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯১ জনে। আক্রান্তদের বেশিরভাগ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটের বাসিন্দা। এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়ে প্রথম এক রোগী মা’\রা যায় ২০০০ সালে। ২০২৫ সালে একই রোগে মৃ’\তের সংখ্যা ২৫৪, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম।

এইডস/এসটিডি কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার ২০১৭ সালে ছিল ০.৭ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩.১ শতাংশে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই হার আরও বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে বলে কর্মশালায় জানানো হয়। এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো, চিকিৎসা সহজলভ্য করা এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করাকে জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বিদেশফেরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।

আকতার জাহান শিল্পী তার প্রবন্ধে জানান, দেশে অনুমিত এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি ১৭ হাজার ৪৮০ জন। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৩১৩ জন। সংক্রমণের হার ০.০১ শতাংশ। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৫ জন চিকিৎসার আওতায় এসেছেন, যা মোট শনাক্তের ৭৪ শতাংশ।

তিনি জানান, আক্রান্তদের ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী এবং ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী। এছাড়া প্রবাসী ১২ শতাংশ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ১১ শতাংশ, শিরায় মাদকগ্রহণকারী ৬ শতাংশ, নারী যৌনকর্মী ও হিজড়া ১ শতাংশ করে। বাকি ২২ শতাংশ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষ।

আক্রান্তদের বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬২.৬১ শতাংশের বয়স ২৫ থেকে ৪৯ বছর। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২১.০৫ শতাংশ। ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ০.৬৯ শতাংশ। আর ৫ বছরের কম বয়সে আক্রান্ত ১.৯৬ শতাংশ।

রাশেদ রাব্বি তার উপস্থাপনায় বলেন, দেশে এইডসের ক্ষেত্রে একসময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছিল শিরায় মাদকগ্রহণকারী, প্রবাসী শ্রমিক, নারী যৌনকর্মী, পুরুষ যৌনকর্মী ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ। ২০২০ সালের পর থেকে দেখা গেছে, সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্তের হার বাড়তে শুরু করে এবং এখন তারা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসেছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন প্রবাসী শ্রমিকরা। এইচআইভি/এইডস নিয়ন্ত্রণে বিদেশ থেকে ফেরার সময় শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে আক্রমণ বা স্টিগমার মুখে ফেলা হলে তারা চিকিৎসা থেকে দূরে সরে যায়। এতে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তার ভাষায়, স্টিগমা ও বৈষম্য মানুষকে ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ ঠেলে দেয়; ফলে তারা চিকিৎসা নিতে ভয় পায়।