তথ্য গোপন করে হাইকোর্ট থেকে জামিন নেওয়া, এরপর সেই আদেশে বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর সেটি বদলে ফেলা—এমন চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনায় আলোচনায় উঠে এসেছে চট্টগ্রামের এক মামলার আসামি। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা সেই পরিবর্তিত জামিন আদেশ কারাগারে দাখিল করে মুক্তি পান ‘কুকি-চিন’ সংশ্লিষ্ট মামলার আসামি সাহেদুল ইসলাম, যিনি চট্টগ্রামে অবস্থিত ‘রিংভো অ্যাপারেলস’-এর মালিক।
প্রায় সাত মাস আগে উচ্চ আদালতে সংঘটিত এই ঘটনা সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসে, যখন একই মামলার আরেক আসামি জামিন নিতে গিয়ে সাহেদুল ইসলামের জামিনের উদাহরণ তুলে ধরেন। বিষয়টি সামনে আসার পর তা সরাসরি প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী (Zubayer Rahman Chowdhury)-এর নজরে আনেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল (Barrister Md. Ruhul Quddus Kajal)। অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী (Muhammad Habibur Rahman Siddiqui)-কে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেন। ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অগ্রগতিও হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এ ঘটনায় হাইকোর্ট বিভাগের কোনো বেঞ্চ কর্মকর্তা বা ফৌজদারি শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত আছেন কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইনজীবীদের মতে, এত বড় জালিয়াতি অভ্যন্তরীণ সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয়। ফলে ঘটনার গভীরে গিয়ে জড়িতদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, তথ্য গোপন ও জামিন জালিয়াতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে এবং তদন্ত চলছে। শিগগিরই বিস্তারিত জানা যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ঘটনার পটভূমি
২০২৫ সালের ১৭ মে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় একটি পোশাক কারখানার গুদাম থেকে ২০ হাজার ৩০০টি পোশাক জব্দ করা হয়, যা পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (Kuki-Chin National Front)-এর সদস্যদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় রিংভো অ্যাপারেলসের মালিক সাহেদুল ইসলাম ছাড়াও গোলাম আজম ও নিয়াজ হায়দারকে আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, প্রায় দুই কোটি টাকার বিনিময়ে সংগঠনটির সদস্যদের কাছ থেকে পোশাক তৈরির অর্ডার নেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের প্রডাকশন ম্যানেজারকে সাক্ষী রাখা হয়।
উল্লেখ্য, বান্দরবানের রুমা উপজেলায় ২০২২ সালের শুরুতে এই সংগঠনের অস্তিত্ব সামনে আসে। বমসহ কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়ে সংগঠনটি গঠিত হয়েছে বলে জানা যায়, এবং স্থানীয়ভাবে এটি ‘বম পার্টি’ নামেও পরিচিত।
যেভাবে ঘটল জালিয়াতি
সাহেদুল ইসলাম হাইকোর্টে জামিন চাইলে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি আব্দুল্লাহ ইউসুফ সুমনের দ্বৈত বেঞ্চে তার আবেদনটি শুনানির জন্য ওঠে। একই দিনে অনলাইন কার্যতালিকায় ‘সাহেদুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র’ নামে একাধিক মামলা তালিকাভুক্ত ছিল, যেখানে টেন্ডার নম্বরের পুনরাবৃত্তি নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের তথ্যমতে, যে মামলায় সাহেদুল ইসলাম জামিন পান, সেটির এজাহার ছিল ভিন্ন এবং সেখানে ‘কুকি-চিন’ সংশ্লিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না। সেই মামলায় বিচারপতিরা স্বাক্ষর করার পর প্রথম পৃষ্ঠার তথ্য বদলে দিয়ে অন্য মামলার নম্বর, থানার নাম এবং অভিযোগের ধারা বসিয়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি এই জামিন আদেশ কারাগারে জমা দিয়ে মুক্ত করা হয় সাহেদুল ইসলামকে। বিষয়টি সামনে আসে যখন একই মামলার অন্য এক আসামি জামিন শুনানিতে এই আদেশের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। এরপর খোঁজ নিয়ে জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত হয় অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং তা প্রধান বিচারপতির নজরে আনা হয়।
