সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পুটামারা গ্রামের বদরুজ্জামান ও তার স্ত্রী হাফিজা বেগম—দু’জনই দিনমজুর। সংসারে চার অবুঝ সন্তান। প্রতিদিন ভোরে সন্তানদের ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে জীবিকার তাগিদে কাজে বের হয়ে পড়তেন তারা। কিন্তু কে জানতো, এক সকালেই সবকিছু বদলে যাবে—একটি সড়ক দু’\র্ঘটনায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে তাদের পরিবার।
গতকাল সিলেটের তেলিবাজার এলাকায় ভয়াবহ সড়ক দু’\র্ঘটনায় যে আটজন নি’\হত হয়েছেন, তাদের মধ্যে বদরুজ্জামানও রয়েছেন। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। আর তার স্ত্রী হাফিজা বেগম গুরুতর আ’\হত অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার মুহূর্তে স্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন বদরুজ্জামান।
হাসপাতালের বেডে তখন এক করুণ দৃশ্য—মুমূর্ষু হাফিজার পাশে বসে আছে তাদের চার সন্তান। তারা বুঝতেই পারছে না, তাদের বাবা আর নেই। হাফিজারও পুরোপুরি জ্ঞান ফেরেনি। মাঝে মধ্যে চোখ খুলে সন্তানদের দিকে তাকাচ্ছেন, কিন্তু জানেন না তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসাটি চিরতরে হারিয়ে গেছে।
জীবিকার তাগিদে হাওরপাড়ের মানুষ প্রতিদিন শহরমুখী হন। সুনামগঞ্জ অঞ্চলে অকাল বন্যায় ধান নষ্ট হওয়ায় অনেকেই কাজের খোঁজে সিলেট নগরীতে ভিড় করছেন। প্রতিদিন ভোরে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন শ্রমিকরা। ঠিকাদাররা এসে তাদের ‘কামলা’ হিসেবে নিয়ে যান নির্মাণ কাজে। খোলা পিকআপ বা ট্রাকে গাদাগাদি করে দূরের কাজে নিয়ে যাওয়া—যা আইনত নিষিদ্ধ—তবুও বাস্তবতায় তা নিত্যদিনের ঘটনা।
ঘটনাদিন ভোর ৬টার দিকে সিলেট নগরী থেকে ২৫ জন শ্রমিককে নিয়ে একটি পিকআপ ভ্যান রওনা হয় গোয়ালাবাজারের দিকে। উদ্দেশ্য ছিল একটি ভবনের ঢালাইয়ের কাজ। কিন্তু শহরের অদূরে তেলিবাজারের সুনামগঞ্জ বাইপাসে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সঙ্গে পিকআপটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। কিছুক্ষণ পর শোনা যায় মানুষের আর্তনাদ। সড়কের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিলেন শ্রমিকরা। ঘটনাস্থলেই চারজন নি’\হত হন। গুরুতর আ’\হতদের দ্রুত উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে আরও চারজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
পিকআপটিতে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের পাশাপাশি ছিল ঢালাই কাজে ব্যবহৃত ভারী মেশিন। দুর্ঘটনার সময় অনেকেই ওই মেশিনের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা চালায়।
নি’\হতদের মধ্যে রয়েছেন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের মো. সুরুজ আলী, সেঁততি গ্রামের মোসা. মুন্নি বেগম, নুরনগর এলাকার ফরিদুল, ধর্মপাশার সরিবা গ্রামের নার্গিস, কোম্পানীগঞ্জের বদরুজ্জামান, শিবপুর গ্রামের পাণ্ডব বিশ্বাস এবং বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দুই ভাই আজির উদ্দিন ও আমির উদ্দিন।
আ’\হতদের মধ্যে রয়েছেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার আলমগীর, সিলেট নগরের তোরাব উল্লাহ, রামিন, আফরোজ মিয়া, ধর্মপাশার রাভু আক্তার, হাফিজা বেগম ও দিরাই উপজেলার রাজা মিয়া। এছাড়া রহিম নামের একজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (Sylhet Metropolitan Police)-এর উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রিয়াজুল কবির জানান, ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে আরও চারজনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে কয়েকজন গুরুতর আ’\হত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।


