ভোটার তালিকা থেকে নাম উধাও—মুর্শিদাবাদে পরিচয় সংকটে মুসলিম পরিবার, বাড়ছে ‘নয়া কাশ্মীর’ আশঙ্কা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বাহুতলীর বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম (Aminul Islam) পেশায় একজন সরকারি কর্মকর্তা। অথচ নিজ দেশেই এখন তিনি পরিচয় সংকটে ভুগছেন। সম্প্রতি ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার পর তার ১২ সদস্যের যৌথ পরিবারের ৯ জনের নাম ভোটার তালিকা থেকে গায়েব হয়ে গেছে। সব ধরনের বৈধ নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও এমন বাদ পড়া তাদের জীবনে তৈরি করেছে গভীর অনিশ্চয়তা।

পরিবারের ভেতরেই এর প্রভাব ভয়াবহ। তার অশীতিপর বৃদ্ধ মা নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। অন্যদিকে চিকিৎসক বোন মধ্যপ্রাচ্যে চাকরির সুযোগ পেয়েও ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় পাসপোর্ট করতে পারছেন না। হতাশা আর শঙ্কার ভেতর দিয়ে দিন কাটাতে থাকা আমিনুল আক্ষেপ করে বলেন, “মনে হচ্ছে আমরা নিজ দেশেই পরবাসী হয়ে গেছি।”

একই বেদনা শোনা যায় দৈলতাবাদ গ্রামের আসিফের (ছদ্ম নাম) কণ্ঠে। নথিপত্র হাতে নিয়ে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ছুটছেন তিনি। কিন্তু সহযোগিতা তো দূরের কথা, বরং বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ভিটেমাটি বিক্রি করে বাংলাদেশে চলে যাওয়ার হুমকিও পাচ্ছেন।

এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। বরং এক বৃহৎ মানবিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে, যা পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ মানুষের ওপর ছায়া ফেলেছে—যাদের বড় অংশই মুসলিম।

পরিসংখ্যানের ভাষায় বৈষম্যের চিত্র

কলকাতাভিত্তিক সংস্থা শবর ইনস্টিটিউট (Shobar Institute) এবং ফ্যাক্ট-চেক প্ল্যাটফর্ম অল্ট নিউজ (Alt News)-এর তথ্যমতে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯২ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে অথবা ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রাখা হয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এদের প্রায় ৬০ শতাংশই মুসলিম, যা জনসংখ্যার অনুপাতের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি।

এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি এলাকায়। নন্দীগ্রামে মুসলিম জনসংখ্যা মাত্র ২৫ শতাংশ হলেও বাদ পড়া ভোটারের প্রায় ৯৫ শতাংশই মুসলিম। একইভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-এর কেন্দ্র ভবানীপুরে হিন্দুদের তুলনায় মুসলিম ভোটারদের বাদ পড়ার হার বহুগুণ বেশি।

এমনকি সমাজের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরাও বাদ পড়ার তালিকা থেকে রেহাই পাননি। কলকাতা হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শহীদুল্লাহ মুন্সি ও তার পরিবারের নামও একসময় এই তালিকায় ছিল—যা পরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সংশোধন করা হয়।

মালদহ-মুর্শিদাবাদে অঘোষিত চাপ ও ভয়ের পরিবেশ

পরিসংখ্যানের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। মালদহ ও মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে পরিস্থিতি এমন যে, অনেকেই এটিকে ‘নয়া কাশ্মীর’ হিসেবে তুলনা করছেন। কালিয়াচকের শাহবাজ (ছদ্ম নাম) ধর্মীয় পোশাক পরার কারণে হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

হাবিবপুরের মাওলানা মুহিবুর রহমান জানান, ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর নজরদারি ও হয়রানি বাড়ছে।

সীমান্তবর্তী মাহদিপুরের তাহের (ছদ্ম নাম) বলেন, বাংলাদেশে আত্মীয়তা থাকার কারণে গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদ, ফোন তল্লাশি এমনকি পরিবারের নারীদেরও জেরা করা হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

নির্বাচনি সমীকরণে নতুন কৌশল?

সূত্রগুলো বলছে, পুরো প্রক্রিয়ার আড়ালে থাকতে পারে পরিকল্পিত ‘ইলেকটোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং’। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া এক ভিডিওতে একজন নেতাকে বিপুল অর্থের বিনিময়ে মুসলিম ভোট বিভাজনের পরিকল্পনা করতে দেখা গেছে।

গত বিধানসভা নির্বাচনে অন্তত ৩৬টি আসনে জয়ের ব্যবধান ছিল পাঁচ হাজারের কম ভোট। অথচ এসব এলাকাতেই এবারের বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা সেই ব্যবধানের চেয়ে বেশি। যেহেতু মুসলিম ভোট সাধারণত বিজেপিবিরোধী হিসেবে ধরা হয়, তাই এই বাদ পড়া ভোটারদের প্রভাব নির্বাচনি ফলাফলে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকটের ছায়া, বাড়ছে উদ্বেগ

এই পরিস্থিতি অনেকের কাছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের শুরুর দিকের চিত্র মনে করিয়ে দিচ্ছে। এমনকি ঐতিহাসিকভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলোর নামও বাদ পড়েছে—যার মধ্যে মীর জাফরের বংশধররাও রয়েছেন।

২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময়ের পর ভারতকে বেছে নেওয়া বহু মুসলিম পরিবারও এখন নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। তখন যে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

‘পুশ-ইন’ আতঙ্ক ও আঞ্চলিক প্রভাব

এই দীর্ঘসূত্রতা শেষ পর্যন্ত সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর তথ্যমতে, গত এক বছরে হাজারো মানুষকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে সীমান্তে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বিজিবিও একাধিক পুশ-ইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে—এ সংকট শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—মালদহ ও মুর্শিদাবাদ কি সত্যিই ভারতের মানচিত্রে নতুন এক ‘কাশ্মীর’ হয়ে উঠছে? নাকি লাখো মানুষের চোখের জলই একদিন এ প্রশ্নের উত্তর হয়ে দাঁড়াবে?