‘বাবার দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ বিতর্কে মুখ খুললেন ইসরাফিল—সমালোচনার মধ্যেই ব্যাখ্যা ও পরিকল্পনার কথা

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন অ্যাডহক কমিটিতে রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার মধ্যেই নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করলেন ইসরাফিল খসরু (Israfi l Khasru)। এই কমিটিতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে হিসেবে তার অন্তর্ভুক্তি, পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের স্বজনদের উপস্থিতি ক্রীড়াঙ্গনে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ (Hasnat Abdullah) এই কমিটিকে কটাক্ষ করে ‘বাবার দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ বলে উল্লেখ করেন। বিশেষ করে ক্রিকেটীয় পেশাগত অভিজ্ঞতা ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়ায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—কী যোগ্যতায় দেশের ক্রিকেট পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলো এসব ব্যক্তিকে?

এই বিতর্কের প্রেক্ষাপটে দৈনিক মানবজমিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরাফিল খসরু বলেন, সমালোচনাকে তিনি ইতিবাচকভাবেই দেখেন। তার ভাষায়, “সমালোচনা আমাকে মোটিভেট করে। গত সতেরো বছর রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরাসরি ক্রীড়াঙ্গনে কাজ করার সুযোগ পাইনি, তবে সবসময় ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।”

তিনি জানান, স্কুলজীবনে নিয়মিত ক্রিকেট খেলেছেন এবং পরে বিদেশে পড়াশোনা করলেও খেলাটির প্রতি তার আগ্রহ কমেনি। সাবেক জাতীয় কোচ সারোয়ার ইমরান (Sarwar Imran)-এর অধীনে প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

নিজের ক্রিকেটে আসার পেছনের গল্প ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “স্কলাস্টিকায় পড়ার সময় থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ঝোঁক বাড়ে। পরে আমেরিকায় পড়তে যাই। দেশে ফিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সরাসরি কাজ করা হয়নি। এখন সেই সুযোগ পেয়েছি।”

সংগঠক হিসেবে তার সম্পৃক্ততা নিয়েও কথা বলেন ইসরাফিল। শতদল ক্লাব ও এক্সিম ক্রিকেটার্সের কাউন্সিলর হিসেবে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার লক্ষ্য ক্রিকেটের সার্বিক উন্নয়ন। খেলোয়াড়রাই সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার। তাদের প্রয়োজন বোঝা এবং সঠিক সেবা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।”

বোর্ডে অন্তর্ভুক্তির পেছনে তামিম ইকবাল (Tamim Iqbal)-এর ভূমিকার কথাও স্বীকার করেন তিনি। “তামিমের সঙ্গে বহুদিনের পরিচয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে আমাদের নিয়মিত আলোচনা হতো। তার অনুরোধেই এখানে আসা,”—বলেন তিনি।

বোর্ডে এসে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি তাকে বিস্মিত করেছে, সেটিও তুলে ধরেন ইসরাফিল। তার মতে, বিসিবির আর্থিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও খেলোয়াড়দের পেছনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়নি। একাডেমির অবকাঠামো আন্তর্জাতিক মানের নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে নারী দলের পারফরম্যান্সকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

স্টেডিয়ামগুলোর ভগ্নদশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্পদের ঘাটতি নয়, বরং দূরদর্শিতার অভাবই মূল সমস্যা। “আমরা এই মানসিকতা পরিবর্তন করতে চাই। খেলোয়াড়দের পেছনে বিনিয়োগ বাড়ালে দর্শক মাঠে ফিরবে, স্পন্সরশিপও বাড়বে,”—তার মন্তব্য।

ঘরোয়া ক্রিকেট ও ফ্র্যাঞ্চাইজি লীগের দুরবস্থা নিয়েও কথা বলেন তিনি। তার মতে, নিয়মিত প্রতিযোগিতা না থাকায় পাইপলাইন দুর্বল হয়ে পড়েছে। ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ ও জাতীয় লিগে পেশাদারিত্বের অভাব ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব প্রসঙ্গে ইসরাফিল বলেন, “সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। এই ফান্ড ক্রিকেট উন্নয়নের জন্যই ব্যয় হবে। আমরা চাই তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ লীগ নিয়মিত আয়োজন করা হোক।”

সমালোচনা, বিতর্ক এবং প্রত্যাশার চাপের মধ্যেই এখন বিসিবির নতুন এই কমিটির দিকে তাকিয়ে আছে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা—দেখার বিষয়, এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে তারা কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।