২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছা’\ত্র-জনতার র’\ক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর জনরোষের মুখে কার্যক্রম নি’\ষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ (Awami League) এখন আবারও তাদের অঙ্গসংগঠন ছা’\ত্রলীগ ও যু’\বলীগকে পুনর্গঠনের গু’\প্ত তৎপরতায় নেমেছে বলে দাবি উঠেছে বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা পুরোনো ক্যাডারদের নতুন করে সংঘবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
সূত্রগুলো বলছে, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় নি’\ষিদ্ধ দুই সংগঠনের পুরোনো কাঠামো সচল করার চেষ্টা করছেন পলাতক নেতারা। ইতোমধ্যে ছা’\ত্রলীগের অন্তত ৫০টি ইউনিটে কথিত ‘পকেট কমিটি’ গঠনের তথ্য পেয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছা’\ত্রলীগের সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস শেষ হলে যু’\বলীগের ইউনিট কমিটিগুলোও ঘোষণা করা হবে। এসব কমিটিতে বাছাই করা ক্যাডারদের অন্তর্ভুক্ত করার নীলনকশা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ভা’\রতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় নতুন কমিটি গঠনের কার্যক্রম চলছে। তাদের নির্দেশে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল, গভীর রাতে শপথ অনুষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পোস্টারিংয়ের মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সংগঠনগুলোর অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
দীর্ঘ নীরবতার পর নি’\ষিদ্ধ সংগঠনগুলোর এমন সক্রিয়তা রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। নিরাপত্তা সংস্থার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, এসব বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি সুসংগঠিত ‘প্রতিবিপ্লবের প্রাথমিক মহড়া’। সেই কারণেই আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নি’\ষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মত দিয়েছেন তারা।
আমার দেশ-এর হাতে আসা কয়েকটি নথিপত্রে দেখা গেছে, বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা কমিটিতে নি’\ষিদ্ধ ছা’\ত্রলীগের প্যাড ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে পলাতক কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন (Saddam Hossain) ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের স্বাক্ষর ও সিলও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ঢাকা আইন জেলা শাখার নাম পরিবর্তন করে ‘সম্মিলিত আইন জেলা শাখা’ করা হয়েছে। সেখানে সভাপতি হিসেবে আব্দুর রাজ্জাক এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাতিন মিয়ার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে সম্মিলিত বেসরকারি চিকিৎসাবিজ্ঞান শাখা, সলিমুল্লাহ কলেজ শাখা, চুয়াডাঙ্গা (Chuadanga), খাগড়াছড়ি ও ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলাসহ বিভিন্ন স্থানে কমিটি গঠনের তথ্য উঠে এসেছে।
এছাড়া জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়ন ছা’\ত্রলীগের কমিটিতেও নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ঢাকা মহানগর উত্তর ছা’\ত্রলীগের কমিটিও পুনর্গঠন করা হয়েছে।
ক্যাম্পাসভিত্তিক অস্থিরতা তৈরিরও অভিযোগ উঠেছে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দাবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka), চট্টগ্রাম ও পাবনাসহ বিভিন্ন স্থানে ছা’\ত্রদল ও ছা’\ত্রশিবিরের মধ্যে সৃষ্ট সাময়িক উত্তেজনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। ছদ্মবেশে থাকা ক্যাডাররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৬ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (University of Chittagong) ক্যাম্পাসে ‘ফ্যাসিস্ট নয়, বাংলাদেশের আর্টিস্ট শেখ হাসিনা’ স্লোগানসংবলিত পোস্টার লাগানো হয়। পরে শিক্ষার্থীরা সেগুলো ছিঁড়ে ফেলেন। নিরাপত্তা সূত্রগুলোর আশঙ্কা, ছা’\ত্ররাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে উসকে দিয়ে অস্থির পরিবেশ তৈরি করাই এসব তৎপরতার উদ্দেশ্য।
গত ২৪ এপ্রিল রাজধানীসহ দেশের অন্তত ১৭টি স্থানে ছা’\ত্রলীগ ও যু’\বলীগের ঝটিকা মিছিল পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিছিলগুলো ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই মুখ ঢেকে বা হেলমেট পরে ছিলেন। কোথাও ১০-২০ জন, কোথাও ২৫ জনের মতো অংশ নেয়। উত্তরা, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীতেও এমন মিছিলের খবর পাওয়া যায়।
এরপর গত শনিবার সকালে ঢাবির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে নি’\ষিদ্ধ ছা’\ত্রলীগের ১০-১২ জনের একটি ঝটিকা মিছিল হয়। এ সময় একটি মাইক্রোবাসসহ দুজনকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের একজন ছিলেন এফ রহমান হল ছা’\ত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফারহান তানভীর নাসিফ।
সবশেষ রোববার রাতে চট্টগ্রাম (Chattogram) নগরীর হালিশহরের নয়াবাজার বিশ্বরোড এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে গু’\প্ত বৈঠক থেকে নি’\ষিদ্ধ ছা’\ত্রলীগের ১৪ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, এটি কোনো সামাজিক আড্ডা ছিল না; বরং দেশের বাইরে অবস্থানরত নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের পরিকল্পনা করা হচ্ছিল।
গত ২৪ এপ্রিল নেত্রকোনায় হারিকেন ও মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে যু’\বলীগের মিছিলের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিকমাধ্যমে। একইভাবে লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে নদীর পাড়ে রাতের আঁধারে শপথ নেওয়ার ভিডিওও ভাইরাল হয়। সেখানে ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’ স্লোগান দিতে দেখা যায় অংশগ্রহণকারীদের।
এদিকে গৌরনদীতে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ঝটিকা মিছিলের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওর বর্ণনায় বলা হয়, বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য সেরনিয়াবাত আশিক আবদুল্লাহর নির্দেশনায় এ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভা’\রতে পালিয়ে যাওয়ার পর ১১ মে সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধন করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নি’\ষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর ফলে দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। তবে সম্প্রতি কক্সবাজারের একদল আইনজীবী আওয়ামী লীগের রাজনীতি পুনর্বহালের দাবিতে জাতিসংঘ ও সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের যেকোনো অপচেষ্টা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক থাকারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং তৃণমূল পর্যায়ে সতর্ক নজরদারি। অন্যথায় গু’\জব, বিভ্রান্তি ও সংগঠিত অপতৎপরতার সুযোগ নিয়ে জননিরাপত্তা আবারও বিঘ্নিত হতে পারে।
