বাংলাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তঘেঁষা ভারতের দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ আসাম (Assam) ও পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)-এ হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতির বড় উত্থান ঘটেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party)। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে সরিয়ে গেরুয়া শিবিরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
ভারতের প্রাদেশিক রাজনীতিতে সরকার পরিবর্তন সাধারণত দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে না। কংগ্রেস বা বিজেপি—যেই ক্ষমতায় থাকুক, পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক কাঠামো প্রায় একই থাকে। কিন্তু এবার আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শক্তিশালী অবস্থান বাংলাদেশের জন্য ভিন্ন মাত্রার উদ্বেগ তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচনের আগে দুই প্রদেশেই ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার বাতিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাদ পড়াদের বড় অংশ সংখ্যালঘু মুসলমান। এমনকি ঐতিহাসিকভাবে প্রভাবশালী মুসলিম পরিবারগুলোর সদস্যরাও তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। ‘নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ৯২ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।
বিজেপির নাগরিকত্ব নীতিকে ঘিরে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের ভাষ্য, ‘বাংলাদেশি’ কিংবা ‘রোহিঙ্গা’ তকমা দিয়ে বহু মানুষকে নাগরিকত্বহীন অবস্থায় ফেলে রাখা হতে পারে। সময়-সুযোগ বুঝে তাদের বাংলাদেশমুখী করার চেষ্টাও হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে দুই প্রদেশের আইনসভায় মুসলমান প্রতিনিধিত্ব আরও কমে যাওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটার থাকলেও এবারের নির্বাচনে বিজেপির প্রচারণার বড় অংশজুড়ে ছিল মুসলমান ইস্যু। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবেই মুসলমানদের উপস্থাপন করা হয়। অন্যদিকে নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে মুসলিম ভোটারদের বড় অংশ তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
ফলাফলে দেখা যায়, বিজেপি ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে ২০৬টি আসন পেয়েছে। বিপরীতে তৃণমূল কংগ্রেস ৪১ শতাংশ ভোট নিয়ে পেয়েছে ৮১টি আসন। দলটির প্রাপ্ত আসনের প্রায় অর্ধেকেই মুসলিম প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।
একইভাবে আসামেও মুসলিম বিজয়ীদের প্রায় সবাই কংগ্রেসঘনিষ্ঠ। বিজেপি সেখানে ১০২টি আসন পেয়েছে। কংগ্রেস পেয়েছে ২১টি আসন, যার মধ্যে ১৮ জন মুসলমান। বদরুদ্দিন আজমলের এআইডিএফ থেকেও তিনজন জয়ী হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পশ্চিমবঙ্গ বা আসামে কোনো মুসলমানকে বিজেপি প্রার্থী করা হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গে যেসব আসনে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব বেশি পড়েছে, এমন ৯৪টি আসনের ফলাফল বিশ্লেষণেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে এসব অঞ্চলে তৃণমূল কংগ্রেসের ৭২টি আসন ছিল। এবার তা নেমে এসেছে ৩০-এ। বিপরীতে বিজেপি ২২টি থেকে বেড়ে পেয়েছে ৬৩টি আসন।
সমালোচকদের মতে, মুসলিম ভোটার বাদ দেওয়ার প্রভাব নির্বাচনী ফলাফলে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ধর্মীয় মেরুকরণ এবং সংখ্যাগুরু ভোট একীভূত করার কৌশল বিজেপিকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর সংখ্যালঘু মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দলটির নির্বাচনি ইশতেহার ও নেতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে অনেকে আশঙ্কা করছেন, মুসলিমদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার আরও সংকুচিত হতে পারে।
উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ (Yogi Adityanath)-এর আদলে পশ্চিমবঙ্গে উঠে এসেছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। ফল ঘোষণার পর তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, হিন্দুরা তাকে ভোট দিয়েছেন আর মুসলমানরা মমতাকে সমর্থন করেছেন। সমালোচকদের মতে, এই বক্তব্য ধর্মীয় বিভাজনকে আরও উসকে দেয়।
বিজেপির আদর্শিক ভিত্তি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (Rashtriya Swayamsevak Sangh) বা আরএসএসকে ঘিরেও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও নেতাদের লেখালেখিতে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদী ও নাৎসি চিন্তার প্রভাব ছিল বলে সমালোচকরা দাবি করে থাকেন।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ‘অনুপ্রবেশকারী শনাক্তকরণ’ এবং ‘ডবল-ইঞ্জিন সরকার’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে পাস হওয়া সিএএ আরও জোরালোভাবে বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এর ফলে একদিকে যেমন বাংলাদেশের হিন্দুদের ভারতে যাওয়ার প্রলোভন দেখানো হতে পারে, অন্যদিকে নাগরিকত্ব হারানো মুসলমানদের ওপর বাড়তে পারে চাপ ও নিপীড়ন।
বিজেপির ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এটি কার্যকর হলে মুসলিম পার্সোনাল ল’-সংক্রান্ত অনেক বিধান বাতিল হয়ে যেতে পারে, যা মুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে বড় প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আসামেও রাজনৈতিক মেরুকরণ নতুন মাত্রা পেয়েছে। ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৯ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব বাতিলের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগ রয়েছে, বাদ পড়াদের বড় অংশ মুসলমান।
এবার নির্বাচনের আগে আসামে বিধানসভা কেন্দ্র পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশনের মাধ্যমে মুসলিমপ্রধান আসনের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। এর প্রভাব নির্বাচনী ফলাফলেও পড়েছে। আগে যেখানে বিধানসভায় ৩০ জনের বেশি মুসলিম সদস্য থাকতেন, এবার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ২২-এ।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মার বিভিন্ন বক্তব্যও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে সন্দেহভাজন বাংলাদেশিদের সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার বিষয়ে তার মন্তব্য কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করে। এ নিয়ে ঢাকায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলবও করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এই উত্থান ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি, নাগরিক অধিকার সংকোচন এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই প্রবণতা ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।


