যদি কথার লড়াইয়েই যুদ্ধের নিষ্পত্তি হতো, তবে ইরানের সঙ্গে সংঘাত অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এখন এমন এক যুদ্ধের মধ্যে আটকা পড়েছেন, যা শুরুতে স্বল্পমেয়াদি বলে ধরে নেওয়া হলেও বাস্তবে তা গড়িয়েছে দশম সপ্তাহে। পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার স্পষ্ট পথ খুঁজে পাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প মূলত দুটি ফাঁদের মধ্যে আবদ্ধ। একটি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্যটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ। হরমুজ প্রণালি (Hormuz Strait)-এর ওপর ইরানের কৌশলগত প্রভাব এবং আত্মসমর্পণে তাদের অনীহা এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে গ্রহণযোগ্য সামরিক পন্থায় যুদ্ধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে না।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, তার রাজনৈতিক মূল্যও তত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নেমে এসেছে ৩০ শতাংশের ঘরে। জ্বালানির দাম প্রতি গ্যালনে ৪ দশমিক ৫০ ডলার ছাড়িয়েছে। যুদ্ধবিরোধী মনোভাবও ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক শক্তি তার হাতে খুব সীমিত।
এই অবস্থাই ব্যাখ্যা করে কেন ট্রাম্প একদিকে বারবার শান্তি আলোচনা নিয়ে আশাবাদী বক্তব্য দিচ্ছেন, আবার অন্যদিকে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সামরিক কৌশল বদলে ফেলছেন। পরিস্থিতি যেন একধরনের অনিশ্চয়তা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
সিএনএন (CNN)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দুই দেশ এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে একটি এক পৃষ্ঠার স্মারকলিপি নিয়ে আলোচনা চলছে। এই দলিল যুদ্ধবিরতির ভিত্তি তৈরি করতে পারে এবং অমীমাংসিত ইস্যু সমাধানে ৩০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করবে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, একটি এক পাতার সমঝোতা দলিল দিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের অর্ধশতাব্দীর জটিল দ্বন্দ্বের সমাধান সম্ভব নয়। পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন—এসব ইস্যু এখনো অনিষ্পন্ন।
এর পাশাপাশি ইরান অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিলের দাবি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালিকে একটি বড় কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করে তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ চলাচল থেকে সুবিধা আদায় করতে চায়।
বৃহস্পতিবার পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে মার্কিন প্রস্তাবের জবাব পাঠানোর কথা রয়েছে ইরানের। একাধিক সূত্র বলছে, যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে দুই পক্ষ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। কারণ এই সংঘাতের মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি দ্রুত বেড়ে চলেছে।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন যে একটি ‘চুক্তি’ প্রায় চূড়ান্ত এবং তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু প্রতিবারই পরে স্পষ্ট হয়েছে, ইরান এখনো কঠোর অবস্থানেই রয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি অভিযানের পুনরাবৃত্তি
এই যুদ্ধ শুরু থেকেই কৌশলগত বিভ্রান্তি, আকস্মিক সিদ্ধান্ত এবং সমাপ্তি নিয়ে ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন। সময়ের সঙ্গে সেই প্রবণতা আরও প্রকট হয়েছে।
মঙ্গলবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও (Marco Rubio) উল্লেখ করেন যে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শেষ হয়েছে। এরপর তিনি হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে নতুন উদ্যোগ ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর কথা বলেন। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কয়েকটি জাহাজকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পর সেই অভিযানও স্থগিত হয়ে যায়। পরে ট্রাম্প জানান, তিনি শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে চান।
এই স্বল্পস্থায়ী অভিযানগুলোকে কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ইরান বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পারসি ‘সিলভার বুলেট’ কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ দ্রুত ও নাটকীয় সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে নতি স্বীকারে বাধ্য করার চেষ্টা।
প্রথমে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি (Ali Khamenei)-কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এরপর সামরিক স্থাপনায় তীব্র বোমা হামলা, ইরানি বন্দর অবরোধ এবং পরে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’। কিন্তু এসবের কোনোটিই ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে পারেনি।
কারণ নিহত নেতাদের জায়গা দ্রুত পূরণ করছে তেহরান। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের ভেতরেও ভাঙনের কোনো দৃশ্যমান ইঙ্গিত নেই। বরং ইরানের শাসকগোষ্ঠী এই যুদ্ধকে ইসলামি বিপ্লব টিকিয়ে রাখার অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে তুলে ধরছে। সেই বাস্তবতায় টিকে থাকাটাই তাদের কাছে একধরনের বিজয়।
বুধবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, “সবকিছু খুব ভালোভাবে চলছে। তারা একটি চুক্তি করতে চায়।” কিন্তু তার বক্তব্যে এমন কোনো পরিষ্কার রূপরেখা দেখা যায়নি, যা বোঝায় তিনি যুদ্ধের শেষ কোথায় দেখতে চান।
এই সংঘাত ইতোমধ্যেই একটি বড় শিক্ষা হয়ে উঠছে—অস্ত্রে ও শক্তিতে দুর্বল কোনো রাষ্ট্রও অপ্রতিসম যুদ্ধের মাধ্যমে কীভাবে একটি পরাশক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি চাপে ফেলতে পারে।
আলোচনার টেবিলে দুর্বল যুক্তরাষ্ট্র
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের ব্রিফিংয়ে মার্কো রুবিওর বক্তব্যে অনিচ্ছাকৃতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল অবস্থান প্রকাশ পায়।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়াই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য। তার ভাষায়, “যে কেউ এটি ব্যবহার করতে পারবে। পানিতে কোনো মাইন থাকবে না। কেউ টোল দেবে না।”
এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, ইরান হরমুজকে একটি কার্যকর কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার কেন্দ্রে। এতে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধের কৌশলগত ভারসাম্য কতটা তেহরানের দিকে সরে গেছে।
মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি, ইরানের নিরস্ত্র নাগরিকদের দুর্ভোগ, বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রেক্ষাপটে দ্রুত সমাধান এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
কিন্তু ট্রাম্পের অস্পষ্ট অবস্থান, বারবার অভাবনীয় কূটনৈতিক সাফল্যের দাবি এবং একটি এক পাতার স্মারকলিপিকে শান্তির চাবিকাঠি হিসেবে উপস্থাপন—এসবই তার প্রশাসনের আন্তরিকতা ও সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।


