ফেসবুকের চাকরির ফাঁদে রাশিয়ার যু’\দ্ধে বাংলাদেশি মোহন, মৃতু’\র মুখ থেকে ফিরে এখন দিচ্ছেন সতর্কবার্তা

ফেসবুকে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে বেশি আয়ের আশায় রাশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন মোহন মিয়াজি (Mohon Miaji)। ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের প্রতিশ্রুতি পেলেও বাস্তবে তাকে ঠেলে দেওয়া হয় ইউক্রেন যু’\দ্ধের সম্মুখ সারিতে। সেখানে শ্র্যাপনেলের আঘাতে জখম হওয়া, চোখের সামনে সঙ্গীর মৃ’\ত্যু এবং প্রতিদিন ড্রোন ও গোলাবর্ষণের আতঙ্ক—সব মিলিয়ে আট মাসের এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন তিনি।

গজারিয়ার ৩০ বছর বয়সী মোহন জানান, ফেসবুকে একটি চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে তিনি আগ্রহী হন। সেখানে বর্তমান আয়ের পাঁচ গুণেরও বেশি বেতনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। দেশের অসংখ্য তরুণের মতো তিনিও ভেবেছিলেন বিদেশে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলাবেন।

রাশিয়ায় পৌঁছে শুরুতে পূর্বাঞ্চলের স্ভোবোদনি (Svobodny) এলাকায় ইলেকট্রনিক্সের কাজ পান তিনি। বাংলাদেশের উষ্ণ আবহাওয়া থেকে হঠাৎ মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠান্ডায় কাজ করা ছিল ভীষণ কঠিন। কিন্তু তখনও তিনি বুঝতে পারেননি সামনে আরও বড় দুঃস্বপ্ন অপেক্ষা করছে।

পাঁচ মাস পর ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin)-এর সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করা এক রুশ এজেন্ট তাকে এবং আরও কয়েকজনকে আরও ভালো ও নিরাপদ জায়গায় কাজ দেওয়ার কথা বলে অন্যত্র নিয়ে যায়। বাস্তবে তাদের পাঠানো হয় রোস্তভ-অন-ডনের একটি সামরিক ঘাঁটিতে। সেখানে তিন সপ্তাহ ধরে চলে সামরিক প্রশিক্ষণ।

মোহনের ভাষায়, তাকে বলা হয়েছিল তিনি কখনোই সামনের সারিতে থাকবেন না। কিন্তু পরে তাকে অ্যাসল্ট রাইফেল চালানো, আরপিজি ব্যবহার এবং গ্রেনেড নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তখনও তিনি বিষয়টিকে “স্বাভাবিক নিয়ম” ভেবেই বিশ্বাস করেছিলেন।

পরে দোনেৎস্ক (Donetsk)-এর একটি সেনাছাউনিতে পৌঁছানোর পর কমান্ডার তাকে জানায়, তিনি ইতোমধ্যেই চুক্তিতে সই করে সেই ব্যাটালিয়নের অংশ হয়ে গেছেন। তখন মোহন রিক্রুটিং এজেন্সির কাগজপত্র দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তাকে বেসামরিক কাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কমান্ডার সরাসরি স্বীকার করেন, তাকে প্রতারণা করা হয়েছে।

এরপর তাকে পাঠানো হয় আভদিভকা (Avdiivka) এলাকায়, যেখানে ২০২৪ সালে রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আগে ভয়াবহ লড়াই হয়েছিল। পুতিনের তথাকথিত “মিট গ্রাইন্ডার” কৌশলের অংশ হিসেবে সেখানে একের পর এক সেনাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাঠানো হতো। হাজার হাজার রুশ সেনা সেখানে প্রাণ হারায়।

মোহনকে রাখা হয় একটি লজিস্টিক ইউনিটে। তার কাজ ছিল গোলাবারুদ, অস্ত্র ও জ্বালানি সরবরাহ করা এবং মৃ’\তদেহ উদ্ধার করা। তিনি বলেন, প্রতিবার আশ্রয় নেওয়া পরিখা থেকে বের হতে হলেই ভয়ে কাঁপতেন। সামনের সারিতে যাওয়ার তৃতীয় দিনেই শ্র্যাপনেলের আঘাতে জখম হন তিনি।

এর কিছুদিন পর শুরু থেকেই তার সঙ্গে থাকা আরেক বাংলাদেশি খনিবিস্ফোরণে নি’\হত হন। সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে এখনও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন মোহন।

তার ভাষায়, রাশিয়ার দখল করা এলাকার সীমান্তে মৃ’\তদেহ সংগ্রহ করতে গেলে প্রায়ই ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলার আঘাত হতো। অনেক সময় কয়েক মিটারের মধ্যেই বিস্ফোরণ ঘটত। তখন তার মনে হতো আর হয়তো বেঁচে ফেরা হবে না।

শুধু যু’\দ্ধক্ষেত্রের আতঙ্কই নয়, নিজেদের কমান্ডারদের নির্যাতনের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। মোহনের অভিযোগ, রুশ কমান্ডাররা তাদের বেতন আত্মসাৎ করতেন। প্রতিবাদ করলে শাবল ও রাইফেলের বাট দিয়ে মারধর করা হতো। ভুল করলে সংকীর্ণ বেসমেন্ট সেলে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হতো। তিনি আরও জানান, অনেককে উলঙ্গ করে ছাদ থেকে উল্টো ঝুলিয়ে রাখা হতো।

তার সঙ্গে যু’\দ্ধ করা সেনাদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের মানুষ ছিলেন। নাইজেরিয়া, নেপাল, উগান্ডা, মিসর ও ইরাকের নাগরিকদের পাশাপাশি বহু উত্তর কোরিয়ানেরও দেখা পেয়েছেন তিনি। মোহনের মতে, সেনাবাহিনীর বিপুল ক্ষতি পূরণে দরিদ্র দেশগুলোর মানুষকে বিভিন্ন প্রলোভনে ফাঁদে ফেলছে রাশিয়া।

আট মাস পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে অফিসিয়াল ছুটিতে মস্কো যাওয়ার সুযোগ পান মোহন। তখনও সেনাবাহিনী তার পাসপোর্ট আটকে রেখেছিল। পরে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে অস্থায়ী ভ্রমণ দলিল নিয়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করেন তিনি।

বিমানবন্দরে নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে আলাদা করে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করলেও শেষ পর্যন্ত বিমানে উঠতে সক্ষম হন। দেশে ফিরে পরিবারের কাছে পৌঁছানোর মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, তার মা ভেবেছিলেন আর কখনো ছেলেকে দেখতে পারবেন না। বাড়ি ফিরে দুজনেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এখন ভাইয়ের সঙ্গে বাড়িতে অবস্থান করছেন মোহন। নিজের ভুলের কথা স্বীকার করে তিনি দেশের তরুণদের সতর্ক করছেন। তার দাবি, হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামে ট্রাভেল এজেন্সি কিংবা জব প্লেসমেন্ট প্রতিষ্ঠানের ছদ্মবেশে কিছু চক্র বেসামরিক চাকরির লোভ দেখিয়ে মানুষকে রাশিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে।

মোহনের ভাষায়, এই ফাঁদে সবচেয়ে বেশি পড়ছেন দরিদ্র দেশগুলোর মানুষ। বিপুলসংখ্যক সেনা হারানোর পর রাশিয়া এভাবেই নতুন লোক সংগ্রহ করে সেনাবাহিনীর শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে।