বরিশালে ডেঙ্গু আতঙ্কের মধ্যেই মশা নিধনে ব্যয়ের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন, প্রশ্নের মুখে সিটি করপোরেশন

বরিশালে (Barishal) প্রতিবছরই ভয়াবহ আকার নেয় ডেঙ্গু পরিস্থিতি। আক্রান্তের সংখ্যাও কোনোভাবেই কম নয়। বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত ৭২৮ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬৯২ জন। এমন বাস্তবতায় নগরীতে মশা নিধন কর্মসূচিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম হিসেবে দেখা হলেও, সেই কর্মসূচির ব্যয় নিয়েই এখন উঠেছে একের পর এক প্রশ্ন।

বরিশাল সিটি করপোরেশন (Barishal City Corporation)-এর হিসাব শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও মশা মারতে ফগার মেশিন কেনাসহ ছয় কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বরাদ্দের ৮০ শতাংশ অর্থ এরই মধ্যে ব্যয় করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। অথচ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে একই খাতে সিটি করপোরেশনের ব্যয় দেখানো হয়েছিল মাত্র ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৪৫ টাকা। দুই বছরের ব্যবধানে এই ব্যয়ের ব্যবধানই এখন নগরবাসীর বিস্ময় ও সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

সিটি করপোরেশনের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট গত বছরের ৯ জানুয়ারি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট গত বছরের ৬ আগস্ট প্রকাশ করেছিলেন তখনকার প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার মো. রায়হান কাওছার (Md. Raihan Kauser)।

প্রকাশিত বাজেটে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচ্ছন্নতা শাখার জন্য বরাদ্দ ছিল দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু ওই খাতে খরচ দেখানো হয়েছে ছয় কোটি ৫১ লাখ ৭৩ হাজার ৯০ টাকা। এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও পরিচ্ছন্নতা শাখার বাজেট আরও বাড়িয়ে রাখা হয়েছে ৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এই দুই অর্থবছরের পরিচ্ছন্নতা শাখার ব্যয় সাবেক প্রশাসক রায়হান কাওছারের সময়েই করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ব্যয়ের হিসাব ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিচ্ছন্নতা শাখার মোট খরচ ছিল ৩৫ লাখ ৯৪ হাজার ১৪৫ টাকা। এর মধ্যে মশা মারতে খরচ করা হয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৪৫ টাকা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় খরচ করা হয়েছে ১৪ লাখ ১৪ হাজার ২০০ টাকা। আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী কেনায় খরচ দেখানো হয়েছে মাত্র ৩০ হাজার টাকা।

কিন্তু পরের অর্থবছরেই চিত্র বদলে যায় অস্বাভাবিকভাবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মশা মারায় খরচ দেখানো হয় তিন কোটি ৫৪ লাখ ৩৩ হাজার ৪৭১ টাকা। একই সময়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয় দেখানো হয়েছে এক কোটি ৫৮ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪২ টাকা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী কেনায় ব্যয় দেখানো হয়েছে এক কোটি দুই লাখ ৮১ হাজার ১৭২ টাকা।

পর্যালোচনায় আরও বেরিয়ে এসেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যয় আরও বাড়ানো হয়েছে। এ অর্থবছরে মশা মারায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ছয় কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় খরচ ধরা হয়েছে এক কোটি ৫৭ লাখ টাকা। আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ১০ লাখ টাকা।

মশা মারার ব্যয় এভাবে হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় হতবাক নগরবাসী। সাবেক জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা শাখার ব্যয় বিবরণী নিজেই ছিল ‘অপরিচ্ছন্ন’। তাঁদের দাবি, এই শাখায় কাজের তুলনায় ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতাই বেশি চোখে পড়েছে।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা শাখার প্রধান ইউসুফ আলী (Yusuf Ali) বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মশা মারায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে—এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি বলেন, “আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানি না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবেন। এখানে রাসায়নিক আনতে যে খরচটা হয়, তার চেয়ে বেশি কোনো বিল দেখানো হয় না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২১ লাখ টাকা খরচ হলে সেখানে সাড়ে তিন কোটি টাকার খরচ প্রশ্নবিদ্ধ।”

তবে মশা মারার চলমান কর্মসূচি নিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের কাজগুলো আগের নিয়মেই রুটিনমাফিক চলছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (Citizens for Good Governance) বা সুজনের বরিশাল নগর সম্পাদক মো. রফিকুল আলম বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মশক নিধনের জন্য যে ২১ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে, সেটি গ্রহণযোগ্য। তবে এর পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মশা মারতে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয় দেখানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, “এত বাজেট দিয়ে মশা নিধন হলে বরিশালে তো ডেঙ্গু রোগে কেউ আক্রান্ত হতো না।”

এ বিষয়ে বিসিসির প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন (Bilquis Akter Jahan Shirin) বলেন, এসব ঘটনা তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগের। তাই বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর জানা নেই। তখন দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান বন ও পরিবেশ সচিব এবং সাবেক বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওছার। বিষয়টি তিনিই ভালো বলতে পারবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, মশা মারার জন্য যে রাসায়নিক আনা হয়েছে, তা কার্যকর নয়। বিষয়টি জানার পরই তিনি ঠিকাদার পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন।