অনলাইনে পার্টটাইম চাকরির ফাঁদে গৃহিণীর দুই লাখ টাকা আত্ম’\সাৎ, ঢাকা-মেহেরপুর নেটওয়ার্কে গ্রে’\প্তা’\র ১০

রাজধানীর কলাবাগান এলাকার গৃহিণী নিগার সাবিহা (ছদ্মনাম)। অবসরে ফেসবুক স্ক্রল করছিলেন তিনি। চোখে পড়ে একটি লোভনীয় বিজ্ঞাপন—ঘরে বসে টাকা আয়ের সুযোগ। বিজ্ঞাপনদাতাদের ভাষায়, এটি ছিল ‘অনলাইনে পার্টটাইম জব’। কৌতূহল থেকে সাবিহা যোগাযোগ করেন। জানতে পারেন, কিছু টাকা বিনিয়োগ করে কয়েকটি ‘টাস্ক’ সম্পন্ন করলেই মিলবে বিপুল অঙ্কের লাভ।

লোভ সামলাতে পারেননি সাবিহা। শুরু করেন বিনিয়োগ ও ‘টাস্ক’ সম্পন্ন করা। ১৩ মার্চ থেকে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করেন দুই লাখ আট হাজার ৮৬০ টাকা। ২৬ মার্চ পর্যন্ত তিনি এই টাকা দেন। শুরুর দিকে বিনিয়োগের বিপরীতে লাভের আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ দিকে আর কোনো লভ্যাংশ দেওয়া হচ্ছিল না। কোনো টাস্কও সম্পন্ন করতে বলা হচ্ছিল না। বিজ্ঞাপনদাতারা ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। উপায় না পেয়ে সাবিহা পুলিশের দ্বারস্থ হন। অভিযোগ দেন কলাবাগান থানায়। এরপর রহস্য উদঘাটনে নামে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা, ডিবি।

রাজধানী থেকে মেহেরপুর—প্রতা’\রণা’\র বিস্তৃত নেটওয়ার্ক

তদন্তে উঠে আসে, অনলাইনে পার্টটাইম চাকরির বিজ্ঞাপনদাতাদের নেটওয়ার্ক শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়; এর বিস্তার মেহেরপুর পর্যন্ত। কিন্তু তারা কারা, কেন এমন লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিচ্ছিল এবং এর পেছনের উদ্দেশ্য কী—এসব প্রশ্নের জবাব পেতে অভিযানে নামে ডিবি (Detective Branch-DB)।

ঢাকা থেকে প্রথমে গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) গ্রে’\প্তা’\র হন দুজন। তারা হলেন সাঈদ মোহাম্মদ হাসানু জোহা ও নুরজাহান খাতুন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন ঢাকা থেকে আরও পাঁচজনকে গ্রে’\প্তা’\র করা হয়। তারা হলেন হৃদয় হাসান, মোহাম্মদ রাকিব, মো. রাশেদ, এমআই খাইরুল ও সাদিত হোসেন।

জিজ্ঞাসাবাদে তারা ডিবিকে আরও কয়েকজনের বিষয়ে তথ্য দেন, যারা মেহেরপুরে অবস্থান করছিলেন। এরপর ডিবির একটি দল গত বৃহস্পতিবারই মেহেরপুরের উদ্দেশে রওনা হয়। স্থানীয় সূত্র ধরে পরদিন শুক্রবার (৮ মে) খুঁজে বের করা হয় ওই সাতজনের আরও তিন সহযোগীকে। তারা হলেন মেহেরপুর (Meherpur)-এর গাংনী উপজেলার গাড়াডোব গ্রামের রোহান আলী ওরফে রাকেশ, ফয়সাল আহমেদ এবং সদর উপজেলার কামদেবপুর গ্রামের মো. রনি মিয়া।

এই তিনজনকে ধরার পরই খুলতে থাকে প্রতা’\রণা’\র মূল কৌশল। তারা ডিবির কাছে স্বীকার করেন, খণ্ডকালীন চাকরি বা পার্টটাইম জবের বিজ্ঞাপনই ছিল তাঁদের প্রতা’\রণা’\র প্রধান হাতিয়ার। সংঘবদ্ধভাবে দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে এ ধরনের প্রতা’\রণা চালিয়ে আসছিলেন তারা। মূলত ফেসবুকে আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন প্রচার করে আগ্রহীদের টেনে নেওয়া হতো।

আগ্রহীদের পরে টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে যুক্ত করা হতো। এরপর ‘অনলাইন টাস্ক’ সম্পন্ন করার নামে ধাপে ধাপে টাকা বিনিয়োগে বাধ্য করা হতো। শুরুতে দ্রুত আয়ের লোভ দেখানো, পরে মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়া—এটাই ছিল চক্রটির প্রতা’\রণা’\র কৌশল।

ডিবি জানায়, গত শুক্রবার মেহেরপুরে রোহান ওরফে রাকেশের বাড়ি থেকে তিনজনকে গ্রে’\প্তা’\র করা হয়। গ্রে’\প্তা’\রে’\র সময় তাঁদের কাছ থেকে তিনটি স্মার্টফোন, প্রতা’\রণা’\র মাধ্যমে আত্ম’\সাৎ করা নগদ ১৭ হাজার ৪৪০ টাকা এবং তিনটি গ্রামীণফোনের সিম জব্দ করা হয়।

এ বিষয়ে মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান (Jaminur Rahman Khan) এশিয়া পোস্টকে বলেন, ডিবির একটি টিম তাদের তদন্তাধীন মামলার আসামিদের গ্রে’\প্তা’\র করতে মেহেরপুরে অভিযান পরিচালনা করেছিল। অভিযানে মেহেরপুর জেলা পুলিশের ডিবি সদস্যরা সহযোগিতা করেছেন।

সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটে স্বামী-স্ত্রী

ডিবি সূত্রে জানা যায়, প্রথমে গ্রে’\প্তা’\র হওয়া সাঈদ মোহাম্মদ হাসানু জোহা ও নুরজাহান খাতুন সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। মিরপুর ডিওএইচএস থেকে গ্রে’\প্তা’\র হওয়া এই দম্পতির গ্রামের বাড়ি মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপির চাঁদবিল এলাকায়। ঢাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রে’\প্তা’\র করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, এটি একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতা’\রক চক্র। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে একই কৌশলে প্রতা’\রণা করে আসছিল তারা। চক্রটির বাকি সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রে’\প্তা’\রে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (Dhaka Metropolitan Police-DMP)-এর মিডিয়া উইং জানায়, তিন ধাপে গ্রে’\প্তা’\র হওয়া ১০ জনকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাঁদের কাছ থেকে প্রতা’\রণা চক্রের আরও সদস্য, অর্থ লেনদেনের উৎস এবং আত্ম’\সাৎ করা অর্থ উদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এ জন্য গত শুক্রবার মেহেরপুর থেকে গ্রে’\প্তা’\র হওয়া তিনজনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত প্রত্যেকের এক দিন করে মোট তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির ঢাকা দক্ষিণের ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের উপপরিদর্শক নজরুল ইসলাম (Nazrul Islam) এশিয়া পোস্টকে বলেন, অনলাইনে পার্টটাইম চাকরি, বিনিয়োগ ও দ্রুত লাভ দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রতা’\রণা করে আসছিল। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের মাধ্যমে মেহেরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকজনকে গ্রে’\প্তা’\র করা হয়েছে।

তিনি জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রে’\প্তা’\ররা প্রতা’\রণা’\র সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত রিমান্ড দেন। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রে’\প্তা’\রে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।