টিআইএন আছে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি, রিটার্ন দেননি প্রায় ৭৮ লাখ—করজালে বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে এখন কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন শুধু করদাতার পরিচয়পত্র নয়; নাগরিক জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ সেবা পাওয়ার প্রায় অপরিহার্য চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে। চাকরি, ব্যবসা, জমি-ফ্ল্যাট কেনাবেচা, গাড়ির নিবন্ধন, ব্যাংক ঋণ, ক্রেডিট কার্ড, এমনকি সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর মতো ক্ষেত্রেও এখন টিআইএনের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ফলে আয়কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকলেও শুধু বিভিন্ন সেবা গ্রহণের জন্য লাখ লাখ মানুষ টিআইএন নিচ্ছেন। কিন্তু তাদের বড় একটি অংশ নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (National Board of Revenue-NBR)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি টিআইএনধারী রয়েছেন। অথচ চলতি করবর্ষে রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র সাড়ে ৪২ লাখ করদাতা। অর্থাৎ প্রায় ৭৮ লাখ টিআইএনধারী এখনো রিটার্ন দাখিল করেননি।

কর কর্মকর্তারা বলছেন, এই বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে একটি অংশের করযোগ্য আয় না-ও থাকতে পারে। তবে করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও অনেকেই রিটার্ন দাখিল করছেন না—এমন ধারণাও জোরালো। আর এই বাস্তবতাই সরকারের করজাল সম্প্রসারণের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

টিআইএন ছাড়া যেসব কাজ প্রায় আটকে যায়

বর্তমানে প্রায় ৪০ ধরনের কাজে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে নাগরিক জীবনের নানা স্তরে টিআইএনের উপস্থিতি দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের নির্দিষ্ট সীমার বেশি বেতন হলে টিআইএন প্রয়োজন হয়। একইভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বা প্রশাসনিক পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও টিআইএন দরকার। ব্যবসা করতে চাইলে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার সময়ও টিআইএন প্রয়োজন হয়।

জমি, ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনাবেচা ও নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও টিআইএন ছাড়া কার্যক্রম এগোয় না। গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস নবায়ন কিংবা মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও টিআইএন বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে।

শুধু স্থাবর সম্পদ বা যানবাহন নয়, পেশাগত ক্ষেত্রেও টিআইএনের গুরুত্ব বেড়েছে। ডাক্তার, আইনজীবী, প্রকৌশলী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর নিবন্ধন সনদ পেতে টিআইএন লাগে। এলসি খোলা, আমদানি-রফতানি ব্যবসা, সরকারি দরপত্রে অংশ নেওয়া, ব্যাংক ঋণ গ্রহণ কিংবা ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার ক্ষেত্রেও টিআইএন থাকা জরুরি।

অভিজাত ক্লাবের সদস্যপদ, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসা, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, সিকিউরিটি সার্ভিস, পরিবেশক ব্যবসা, ক্যাটারিং—এসব ক্ষেত্রেও টিআইএন এখন কার্যত অপরিহার্য। এমনকি জাতীয় সংসদ, সিটি করপোরেশন বা উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী হতে গেলেও টিআইএন বাধ্যতামূলক।

কেন রিটার্ন দিচ্ছেন না লাখ লাখ টিআইএনধারী

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে টিআইএন নেওয়ার হার বাড়লেও রিটার্ন জমা দেওয়ার সংস্কৃতি এখনো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি।

অনেকেই শুধু কোনো নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের প্রয়োজনে টিআইএন নেন। কাজ শেষ হলে পরে আর রিটার্ন জমা দেন না। আবার যাদের আয় বছরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার নিচে, তাদের কর দিতে হয় না। তবে বিভিন্ন সেবা পেতে রিটার্নের প্রমাণপত্র চাওয়া হয়। ফলে তাদের কেউ কেউ শূন্য রিটার্ন জমা দেন, আবার অনেকে পরে আর নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করেন না।

করদাতাদের একটি বড় অংশ মনে করেন, কর দিলেও তারা প্রত্যাশিত নাগরিক সুবিধা পান না। এর সঙ্গে যোগ হয় কর অফিসে হয়রানির ভয়, জটিল হিসাবপদ্ধতি এবং তুলনামূলক উচ্চ করহারের ধারণা। এসব কারণ অনেককেই রিটার্ন দাখিল থেকে দূরে রাখে।

অনেকের মধ্যে আরও একটি ভুল ধারণা কাজ করে—একবার করজালে প্রবেশ করলে প্রতি বছরই কর দিতে হবে। বাস্তবে করযোগ্য আয় না থাকলে কর দিতে হয় না, তবে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে যায়। এই বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়ায় অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বা ভয়ের কারণে রিটার্ন জমা এড়িয়ে যান।

রিটার্ন না দিলে কী ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে

আয়কর আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে করদাতারা নানা ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

প্রথমেই আসে জরিমানার বিষয়। রিটার্ন দাখিল না করলে নির্ধারিত করের ওপর ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা আরোপ হতে পারে। সর্বনিম্ন জরিমানা এক হাজার টাকা। দীর্ঘ সময় রিটার্ন না দিলে প্রতিদিন ৫০ টাকা হারে অতিরিক্ত জরিমানাও আরোপ করা হতে পারে।

রিটার্ন না দিলে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত বা কর ছাড়ের সুবিধাও পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র, এফডিআর বা অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ করেও কর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ ছাড়া রিটার্ন জমা না দিলে প্রতি মাসে করের ওপর অতিরিক্ত ২ শতাংশ হারে বাড়তি কর আরোপের বিধান রয়েছে। সময় যত গড়াবে, আর্থিক দায়ও তত বাড়তে পারে।

সবচেয়ে কঠোর দিক হলো, কর কর্তৃপক্ষের হাতে রাষ্ট্রীয় সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ক্ষমতাও রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানির সংযোগ বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রেও রিটার্ন জমার কপি ক্রমেই বাধ্যতামূলক হয়ে উঠছে। ফলে রিটার্ন দাখিল না করলে বেতন-ভাতা আটকে যাওয়ার মতো প্রশাসনিক জটিলতাও তৈরি হতে পারে।

অডিটে পড়লে ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে

করদাতাদের বড় আতঙ্কের একটি হলো আয়কর রিটার্নের অডিট বা নিরীক্ষা। এ বছর প্রায় ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করেছে এনবিআর। পুরো প্রক্রিয়াটি অটোমেটেড পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হয়েছে।

রিটার্নে আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য, ব্যাংক লেনদেনের সঙ্গে তথ্যের গরমিল, অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি, অতিরিক্ত নগদ অর্থ, অস্বাভাবিক ঋণ বা দায়, ভুল বিনিয়োগ তথ্য কিংবা সম্পদ গোপন করার মতো বিষয়গুলো নিরীক্ষায় বিশেষভাবে দেখা হয়।

কর কর্মকর্তারা বলছেন, অনেকেই রিটার্নে বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণভাবে বিপুল পরিমাণ সোনা, নগদ টাকা বা সম্পদ দেখান। আবার অনেকে এফডিআর, সঞ্চয়পত্র, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কিংবা জমি-ফ্ল্যাটের তথ্য গোপন করেন। এসব অসঙ্গতি ভবিষ্যতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।

এখনো রিটার্ন দেওয়া যাবে, তবে গুনতে হবে জরিমানা

ব্যক্তি করদাতাদের আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময় গত ৩১ মার্চ শেষ হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দিতে না পারলেও এখনো রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। করদাতারা আগের দুই বছর পর্যন্ত বকেয়া রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে জরিমানা ও অতিরিক্ত সুদ গুনতে হবে।

এনবিআর জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের পর রিটার্ন দিলে করদাতারা বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সুবিধা পাবেন না। পাশাপাশি বকেয়া করের ওপর ২ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে, যা সর্বোচ্চ ২৪ মাস পর্যন্ত প্রযোজ্য হতে পারে।

এ বছর থেকে অধিকাংশ করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার পাশাপাশি ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কর পরিশোধের সুবিধাও রাখা হয়েছে। করদাতারা অনলাইনে রিটার্নের কপি, আয়কর সনদ ও টিআইএন সনদ ডাউনলোড করতে পারবেন।

তবে যেসব করদাতা নির্ধারিত সময়ের আগে আবেদন করে রিটার্ন জমার সময় বাড়িয়ে নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে জরিমানা বা কর রেয়াত হারানোর নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। নির্ধারিত বর্ধিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে তারা নিয়মিত সুবিধাই পাবেন।

ভুল হলে সংশোধনের পথ খোলা আছে

রিটার্নে ভুল হলে করদাতাদের আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আয়কর আইনে সংশোধিত রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

তবে শর্ত হলো, রিটার্ন জমার ১৮০ দিনের মধ্যে সংশোধন করতে হবে এবং একই করবর্ষে একবারের বেশি সংশোধন করা যাবে না। আর যদি রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচিত হয়ে যায়, তাহলে সংশোধনের সুযোগ আর থাকবে না।

এনবিআর অনলাইনে সংশোধিত রিটার্ন জমার সুবিধা চালু করেছে। করদাতারা ওয়েবসাইটে গিয়ে সংশোধনের আবেদন করতে পারবেন। তবে সংশোধনের ফলে কর বেড়ে গেলে বাড়তি কর ও জরিমানাও পরিশোধ করতে হবে।

কর সংস্কৃতির সামনে বড় প্রশ্ন

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে করজাল সম্প্রসারণ হলেও এখনো কর সংস্কৃতি পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। অধিকাংশ মানুষ টিআইএনকে নাগরিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে নয়, বরং সেবা পাওয়ার একটি শর্ত হিসেবে দেখছেন।

তাদের মতে, কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করা গেলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রিটার্ন দিতে আগ্রহী হবেন। একই সঙ্গে করের বিনিময়ে দৃশ্যমান নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা গেলে করদাতার সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে পারে।