ইরানের (Iran) বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States) ও ইসরায়েল (Israel) যুদ্ধের অভিঘাতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে ভারত (India)। এই অস্থির পরিস্থিতিতে দেশটির অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আমদানিনির্ভর খাতগুলোকে সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) দেশবাসীর প্রতি মিতব্যয়ী হওয়ার বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন।
গত রোববার (১০ মে) হায়দ্রাবাদের এক জনসভায় তিনি ভারতীয়দের জীবনযাপন, ভ্রমণ, জ্বালানি ব্যবহার এবং ভোগব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন। খবর আল জাজিরার (Al Jazeera)।
মোদি বলেন, সংকটের এই সময়ে ব্যক্তিগত অভ্যাসেও দায়িত্বশীলতা জরুরি। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য তিনি কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের মতো আবারও ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ মডেল ব্যবহারের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে সরাসরি সভা-সমাবেশ বা মিটিংয়ের বদলে অনলাইন বৈঠক আয়োজনের কথাও বলেন তিনি। তার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, সরকার শুধু নীতিগত পদক্ষেপে নয়, নাগরিকদের দৈনন্দিন আচরণেও সাশ্রয়ের সংস্কৃতি দেখতে চাইছে।
প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহণ বা কারপুলিংয়ের দিকে ঝোঁকার আহ্বান জানান। পাশাপাশি রান্নার তেল ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া এবং কৃষকদের সারের ব্যবহার অর্ধেক কমিয়ে আনার অনুরোধ করেন। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষার প্রসঙ্গ তুলে তিনি অন্তত এক বছরের জন্য অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে স্বর্ণ কেনা থেকেও বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এই সতর্কতার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তৈরি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা। গত ২৭ ফেব্রুয়ারির পর থেকে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫.৪৫ ডলারে পৌঁছেছে। তেলের এই ঊর্ধ্বগতি ভারতের মতো বড় আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য সরাসরি চাপ তৈরি করেছে।
সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত এই পথ ইরান অবরুদ্ধ করে রাখায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লেগেছে। একই সময়ে ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে তেল ও সারের আমদানি ব্যয় এবং ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। এই অঞ্চলের সঙ্গে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ইউরিয়া সারের সরবরাহ জড়িত থাকায় ভারতের কৃষি খাতও এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
ভারতের আমদানিনির্ভর অর্থনীতি এমনিতেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে চাপ অনুভব করছে। দেশটির আমদানির তালিকায় এককভাবে সবচেয়ে বড় খাত তেল। গত অর্থবছরে এই খাতে ব্যয় হয়েছে ১২৩ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় শীর্ষ আমদানিপণ্য হিসেবে স্বর্ণ কেনায় ব্যয় হয়েছে ৭২ বিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালে তিন কোটির বেশি ভারতীয় বিদেশ ভ্রমণে প্রায় ৩১.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন।
অন্যদিকে ইউরিয়া আমদানিতে ভারত বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি হওয়ায় সার খাতেও ব্যয়ের চাপ বড়। তেল ও সারের মতো অত্যাবশ্যকীয় আমদানি হঠাৎ কমানো কঠিন। তাই সরকার তুলনামূলকভাবে অপ্রয়োজনীয় বা বিলাসী ব্যয়—বিশেষ করে স্বর্ণ কেনা ও বিদেশ ভ্রমণের মতো খাত—নিয়ন্ত্রণ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষার চেষ্টা করছে।
রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার তথ্যমতে, ১ মে পর্যন্ত ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৬৯০.৬৯ বিলিয়ন ডলার। যুদ্ধের আগের রিজার্ভ ৭২৮.৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এমন অবস্থায় তেল ও সারের মতো প্রয়োজনীয় আমদানি অব্যাহত রেখে রিজার্ভ ধরে রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদি সংকটকালীন দায়িত্বশীল জীবনযাপনকে ‘দেশপ্রেম’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার বার্তায় নাগরিকদের প্রতি আহ্বান ছিল—জ্বালানি, বৈদেশিক মুদ্রা ও প্রয়োজনীয় সম্পদের ব্যবহার নিয়ে এখনই সংযমী হতে হবে; কারণ বৈশ্বিক যুদ্ধের অভিঘাত সরাসরি ঘরের অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন ও দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর এসে পড়ছে।


