এস আলমের ব্যাংক দখলের নেপথ্য কাহিনি: গোয়েন্দা কার্যালয়ে আটকে রেখে এসআইবিএল বোর্ড বদলের বিস্ফোরক অভিযোগ #এস_আলম #এসআইবিএল #বাংলাদেশ_ব্যাংক #ডিজিএফআই #ব্যাংক_খাত #আর্থিক_কেলেঙ্কারি

চারপাশে তখন ভোরের নিস্তব্ধতা। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ফজরের নামাজ শেষে প্রতিদিনের মতো হাঁটতে বেরিয়েছিলেন আব্দুর রহমান। বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে হাঁটার সময় হঠাৎ একটি নম্বরবিহীন সাদা মাইক্রোবাস এসে থামে তার পাশে। কয়েকজন শক্তপোক্ত ব্যক্তি তাকে ঘিরে গাড়িতে উঠতে বলেন। রাজি না হলে জোর করেই তুলে নেওয়া হয় তাকে।

প্রায় একই সময়ে উত্তরা এলাকায় সাবেক এসআইবিএল (Social Islami Bank Limited)-এর বোর্ড সচিব হুমায়ুন কবিরের বাসাতেও হাজির হয় সাদা পোশাকের কয়েকজন ব্যক্তি। নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে তাকে জোর করে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের বাধা উপেক্ষা করেই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত স্থানে।

পরে জানা যায়, ওইদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এসআইবিএলের মোট আটজন কর্মকর্তা ও পরিচালককে একইভাবে তুলে নেওয়া হয়েছিল। কেউ হাঁটতে বেরিয়েছিলেন, কেউ গোসল করছিলেন, কেউ আবার সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সবাইকে নেওয়া হয় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কচুক্ষেত এলাকায় একটি গোয়েন্দা কার্যালয়ে।

দীর্ঘ সময় আলাদা কক্ষে আটকে রাখা হয় তাদের। কেউ জানতেন না অন্যদেরও একইভাবে ধরে আনা হয়েছে। সেদিন দুপুরে মতিঝিলে এসআইবিএলের ৪০৪তম বোর্ড সভা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সভার আগেই ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের নাটকীয় প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা ও পরিচালক দাবি করেন, ওই গোয়েন্দা কার্যালয়ের ভেতরেই উপস্থিত ছিলেন এস আলম (S Alam Group)-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো পরিস্থিতি তিনি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন যেন তিনিই সেখানে কর্তৃত্বশালী ব্যক্তি।

হুমায়ুন কবির জানান, তাকে একটি কনফারেন্স রুমে নেওয়া হলে সেখানে এস আলমকে বসে থাকতে দেখেন। পরে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় চেয়ারম্যান, এমডি ও নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যানের পদত্যাগপত্র। অভিযোগ রয়েছে, সাদা কাগজে নেওয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করেই পরে ‘ব্যক্তিগত কারণ’ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র তৈরি করা হয়।

সেদিনের বোর্ড সভা মতিঝিলের পরিবর্তে হোটেল ওয়েস্টিনে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। অথচ সভার এজেন্ডা ছিল ৩৬টি। এর মধ্যে অধিকাংশই স্থগিত রেখে ‘বিবিধ’ অংশে পদত্যাগ ও নতুন নিয়োগসংক্রান্ত ১৪টি প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। কারণ, সকালে তুলে নেওয়া পরিচালকরা সাধারণ পোশাকে থাকলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের জন্য স্যুট, টাই, জুতা পর্যন্ত প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।

ওই ঘটনার পরপরই এসআইবিএলের নিয়ন্ত্রণে আসে এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠরা। নতুন চেয়ারম্যান করা হয় অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল আজিম আরিফকে। নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান হন এস আলমের জামাতা বেলাল আহমেদ। নতুন এমডি হিসেবে নিয়োগ পান কাজী ওসমান আলী।

এরপর থেকেই ব্যাংকটির বড় অঙ্কের ঋণ যেতে শুরু করে এস আলম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ এসআইবিএলের মোট ঋণ দাঁড়ায় ৩৭ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি যায় এস আলম গ্রুপ ও তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে। একই সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকায়।

ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। একপর্যায়ে নগদ অর্থ সংকট দেখা দেয় এবং ২০২৫ সালে আরও চারটি দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হয় এসআইবিএলকে।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank)-এর দ্রুত অনুমোদন। সাধারণত পরিচালক বা এমডি নিয়োগ অনুমোদনে কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগলেও অভিযোগ রয়েছে, সেদিন সন্ধ্যার মধ্যেই সব অনুমোদন সম্পন্ন করা হয়।

ব্যাংক খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে একটি বেসরকারি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ বদলের এমন অভিযোগ বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কে মুজেরি বলেন, একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থে গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

তুলে নেওয়া কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনার সময় তাদের হুমকি দেওয়া হয়েছিল যাতে কেউ গণমাধ্যমে মুখ না খোলেন। পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যেই অনেক পরিচালক পদত্যাগ করেন।

বর্তমানে এস আলমের অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও তিনি বা তার আইনজীবীরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।