ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের ক্ষত কাটাতে কাজ চলছে: অর্থমন্ত্রী

দেশের আর্থিক খাত বর্তমানে “পেইনফুল” এক অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী (Amir Khasru Mahmud Chowdhury)। তিনি বলেছেন, বিগত সময়ে ব্যাংক খাত ও শেয়ারবাজারে কী ঘটেছে, তা দেশের মানুষ জানেন। এখন সেসব সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরিতে সরকার কাজ করছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে দেশের ৩৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি (Bangladesh Startup Investment Company—BSIC)’–এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে অর্থনীতির নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এ ধরনের কর্মযজ্ঞকে তিনি “বিশাল ব্যাপার” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই আয়োজনের মূল বার্তা হলো—স্টার্টআপ বিনিয়োগকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলা। সরকারের ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ নামে একটি কর্মসূচি রয়েছে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই উদ্যোগের আওতায় সৃজনশীল অর্থনীতির বহু কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হবে না। তিনি বলেন, “আমি কথা দিচ্ছি।” আর্থিক খাতে যে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা চলছে, এই উদ্যোগ তারই একটি প্রতিফলন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ব্যাংক খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া সমস্যার কথা তুলে ধরে পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, এসব সংকট সমাধানে সরকার জেপি মরগ্যান (JPMorgan), বিশ্বব্যাংক (World Bank) ও আইএফসি (IFC)-এর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। দেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছিল—এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, সব কথা তিনি বলতে চান না। তবে এই উদ্যোগকে সফল করতে সরকারের পক্ষ থেকে যত ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন, সব দিক থেকেই তা দেওয়া হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank)-এর গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আর্থিক খাতের পরবর্তী ধাপের উন্নয়নে এমন প্রতিষ্ঠান দরকার, যা উদ্ভাবন, শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে। তার ভাষায়, বিএসআইসি দেশীয় মূলধনকে উৎপাদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

গভর্নর জানান, শুরুতে ৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি। পরে প্রতিটি তফসিলি ব্যাংককে তাদের নিট লাভের ১ শতাংশ দিয়ে তহবিল গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এই ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান গঠনে এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ, অর্থাৎ এবিবি, বাংলাদেশ ব্যাংককে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার বিশ্বাস, যে লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গঠিত হয়েছে, তা অবশ্যই সফল হবে।

ড. মোস্তাকুর রহমান বলেন, এই বিনিয়োগের সুফল যেন শুধু শহরকেন্দ্রিক বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। তিনি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণও যেন এই উদ্যোগের সুফল পায়। কারণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এর বাইরে থাকলে দেশের একটি বড় অংশ বঞ্চিত থেকে যাবে। সামনে আরও একটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের কথাও জানান তিনি। ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে এবিবি সহযোগিতা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে দেশের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যৌথ উদ্যোগে প্রথমবারের মতো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়। ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি পিএলসি (বিএসআইসি)’ নামে গঠিত এই প্ল্যাটফর্মের প্রাথমিক মূলধন ধরা হয়েছে ৪২৫ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের স্টার্টআপ খাতে দেশীয় মূলধন জোগানের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

বিএসআইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪২৫ কোটি টাকার, অর্থাৎ প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিল গঠন করা হয়েছে। দেশের ৩৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এই প্ল্যাটফর্মের শেয়ারহোল্ডার। ব্যাংকগুলো প্রতি বছর তাদের নিট মুনাফার একটি অংশ এই তহবিলে দেবে। ফলে এটি কোনো এককালীন তহবিল নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে মূলধন বাড়িয়ে পরিচালিত হবে।

বিএসআইসির আওতায় সিড, লেট-সিড ও সিরিজ-এ—এই তিন ক্যাটেগরির স্টার্টআপে বিনিয়োগ করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তায় পরিচালিত এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পাবে। পুরো কার্যক্রম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রুডেনশিয়াল ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় পরিচালিত হবে বলেও জানানো হয়েছে।