বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের (Sir Keir Starmer) রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কয়েকজন মন্ত্রী এবং ৮০ জনের বেশি এমপি তাকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন—তা এখনই হোক বা খুব নিকট ভবিষ্যতে। এরই মধ্যে একজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। তিনি হলেন স্থানীয় সরকার, ধর্ম ও কমিউনিটি বিষয়ক মন্ত্রী মাইতা ফাহনবুল্লেহ। পদ ছাড়ার পাশাপাশি তিনিও স্টারমারকে নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে লেবার পার্টির (Labour Party) এমপিদের মধ্যে এখনো এ বিষয়ে কোনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি যে, কিয়ের স্টারমারের জায়গায় দল এবং দেশের নেতৃত্বে তারা কাকে দেখতে চান। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি (BBC)।
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভাকে জানিয়েছেন, তিনি সরকার পরিচালনার কাজ চালিয়ে যাবেন। একই সঙ্গে এখনো কোনো নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। ফলে প্রকাশ্যে এখন পর্যন্ত কেউ দায়িত্ব নেওয়ার আগ্রহ দেখাননি। তবে সম্ভাব্য কয়েকজন প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম এরই মধ্যে আলোচনায় উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত কয়েকজনকে ঘিরে লেবারের ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ।
ওয়েস স্ট্রিটিং: ২০২৪ সালে লেবার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে বিরোধী দলে থাকাকালে তিন বছর একই খাতের ছায়ামন্ত্রী ছিলেন। ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
এর আগে তিনি ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টসের সভাপতি এবং লন্ডনের কাউন্সিলর ছিলেন। ২০২৩ সালে প্রকাশিত স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, কীভাবে লন্ডনের ইস্ট এন্ডে একটি কাউন্সিল ফ্ল্যাটে বড় হয়েছেন, ব্যাংক ডাকাত দাদাকে জেলে দেখতে যেতেন এবং একজন সমকামী খ্রিস্টান হিসেবে বেড়ে উঠেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভার সবচেয়ে দক্ষ বক্তা ও যোগাযোগকারীদের একজন হিসেবে দেখা হয়। সরকারে তার অন্যতম সাফল্য হিসেবে এনএইচএসের অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
নেতৃত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা তিনি আগেও খোলাখুলিভাবে বলেছেন। লেবার এমপিদের মধ্যেও তার উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে, বিশেষ করে দলের মধ্যপন্থী ও ডানপন্থী অংশে। মন্ত্রিসভায় তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইল এবং বিজ্ঞানবিষয়ক মন্ত্রী লিজ কেনডাল।
তবে ডানপন্থী প্রার্থী হিসেবে তার ভাবমূর্তি দলীয় সদস্যদের কাছে তাকে অজনপ্রিয় করে তুলতে পারে। কারণ, সাধারণ সদস্যরা সংসদীয় দলের তুলনায় বেশি বামঘেঁষা। আজ বুধবার সকালে কিংস স্পিচের আগে ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের (Wes Streeting) ডাউনিং স্ট্রিটের ১০ নম্বরে কিয়ের স্টারমারের সঙ্গে বৈঠকের কথা।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম: লেবার এমপিদের মধ্যে তার প্রতি শক্ত সমর্থন রয়েছে। জনমত জরিপও বলছে, ভোটারদের কাছে তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় লেবার রাজনীতিক। দীর্ঘ সময় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাকেও তিনি নিজের পক্ষে তুলে ধরতে পারেন। প্রায় এক দশক ধরে তিনি গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ কারণেই তার ডাকনাম হয়ে যায় ‘কিং অব দ্য নর্থ’।
শীর্ষ পদে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বার্নহ্যাম কখনো গোপন করেননি। তবে তার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো—তিনি বর্তমানে এমপি নন।
তার ঘনিষ্ঠরা আশা করছেন, দ্রুতই এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব হতে পারে। চলতি বছরের গোড়ায় গর্টন অ্যান্ড ডেন্টন উপনির্বাচনে লেবারের প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কিয়ের স্টারমারের ঘনিষ্ঠরা দলের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় তা আটকে দেন।
যদি বার্নহ্যাম আবার পার্লামেন্টে ফেরেন, তাহলে সেটি হবে ওয়েস্টমিনস্টারে তার দ্বিতীয় অধ্যায়। ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি লেই আসনের এমপি ছিলেন। ওই সময়ে স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি বিভাগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব পালন করেন।
৫২ বছর বয়সী বার্নহ্যাম দু’বার দলের নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ২০১০ সালে তিনি এড মিলিব্যান্ডের কাছে হেরে যান। ২০১৫ সালে জেরেমি করবিনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয় হন। পার্লামেন্টে তার বড় অংশের সমর্থন আসে দলের বামপন্থী অংশ এবং নর্থ ওয়েস্ট অঞ্চলের এমপিদের কাছ থেকে। ডেপুটি লেবার নেতা লুসি পাওয়েল এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী লিসা ন্যান্ডি তার ঘনিষ্ঠ মিত্র। অ্যান্ডি বার্নহ্যাম (Andy Burnham) যদি প্রতিযোগিতায় নামেন, তাহলে তারা তাকে সমর্থন করতে পারেন।
অ্যানজেলা রেইনার: গত বছর পর্যন্ত অ্যানজেলা রেইনার ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী এবং বৃটেনের রাজনীতির সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী। দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা এবং ১৬ বছর বয়সে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই স্কুল ছেড়ে দেওয়া এক নারীর জন্য এটি ছিল অবিশ্বাস্য উত্থান।
কেয়ার ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করার সময় তিনি ইউনিসন ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখান থেকেই তার রাজনৈতিক যাত্রার শুরু। ২০১৫ সালে তিনি গ্রেটার ম্যানচেস্টারের অ্যাশটন-আন্ডার-লাইন আসন থেকে নির্বাচিত হন এবং দ্রুত ওয়েস্টমিনস্টারে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। পরে জেরেমি করবিনের ছায়ামন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন।
সরকারে তিনি আবাসনমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। দ্রুত বাড়ি নির্মাণ বৃদ্ধি এবং ভাড়াটিয়াদের অধিকার সংস্কারের কাজ তার ওপর ন্যস্ত ছিল। ২০২৫ সালে তিনি নাটকীয়ভাবে পদত্যাগ করেন। কারণ, নতুন বাড়ি কেনার সময় যথেষ্ট কর পরিশোধ না করার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন।
অন্য দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো তারও লেবার এমপিদের মধ্যে শক্ত সমর্থন রয়েছে। তবে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের বামপন্থী রাজনীতিক হওয়ায় তার সমর্থনভিত্তির বড় অংশ বার্নহ্যামের সঙ্গে মিলে যায়। তার বাড়ি কেনা নিয়ে এইচএমআরসির তদন্তের ফল এখনো আসেনি। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামলে সেটি তার জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।
আর কারা আলোচনায়?
তিন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ থাকায় শেষ পর্যন্ত নতুন কোনো চমকপ্রদ প্রার্থীর আবির্ভাবও ঘটতে পারে। কিছু লেবার এমপি সাবেক নেতা এবং বর্তমান জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের (Ed Miliband) ফেরার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছেন। তবে নভেম্বরে বিবিসিকে তিনি বলেন, “আমি সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি—ওই অধ্যায় শেষ।”


