ইরান সংকটে ‘পূর্ণ পরাজয়’-এর আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা রবার্ট কাগানের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী নব্য-রক্ষণশীল চিন্তাবিদ এবং দীর্ঘদিনের ইসরাইলপন্থি যুদ্ধবাজ হিসেবে পরিচিত রবার্ট কাগান (Robert Kagan) ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত নিয়ে তীব্র সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তার মতে, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রকে “পূর্ণ পরাজয়ের” দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং এর ফলে এমন এক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সৃষ্টি হয়েছে, যা সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়।

দি আটলান্টিক (The Atlantic)-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে কাগান বলেন, “আগের অবস্থায় আর ফেরা যাবে না, এমন কোনো চূড়ান্ত আমেরিকান বিজয়ও আসবে না যা এই ক্ষতিকে মুছে ফেলতে পারবে।” তার বিশ্লেষণে উঠে আসে, এই সংঘাত কেবল সামরিক লড়াইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক কৌশলগত অবস্থানকেও গভীরভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে।

১৯৯৭ সালে প্রজেক্ট ফর দ্য নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি (Project for the New American Century)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কাগান যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক আধিপত্য বিস্তারের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিলেন। পরবর্তীতে এই নীতির ধারাবাহিকতায় ২০০৩ সালের ইরাক যু’\দ্ধ শুরু হয়, যা জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল।

কাগান সেই নীতি-নির্ধারণী বলয়ের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন, যেখানে তার স্ত্রী ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড (Victoria Nuland) কট্টর নব্য-রক্ষণশীল ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছিলেন। বছরের পর বছর ধরে কাগান মার্কিন হস্তক্ষেপবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে বর্তমান যু’\দ্ধ নিয়ে তার এই কঠোর সতর্কতা ও হতাশাবাদী মূল্যায়নকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।

তার বিশ্লেষণে হরমুজ প্রণালীর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বিশেষভাবে উঠে এসেছে। কাগানের মতে, এই প্রণালীর উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে এবং ইরানকে শুধু আঞ্চলিক শক্তি নয়, বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “এই যু’\দ্ধ আমেরিকার শক্তি প্রদর্শন করেনি, বরং এমন একটি আমেরিকাকে উন্মোচিত করেছে, যা অবিশ্বস্ত এবং যা শুরু করেছে তা শেষ করতে অক্ষম।” কাগানের মতে, এই বাস্তবতা বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিজেদের কৌশলগত অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণে বাধ্য করবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) প্রশাসনের সামনে এখন বিকল্পের পরিসরও সীমিত হয়ে এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, হরমুজ প্রণালী পুনরায় স্বাভাবিকভাবে সচল করা এবং একইসঙ্গে ইরানের ওপর চাপ ধরে রাখার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের দরকষাকষির ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

বর্তমান সংকটকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের বড় সামরিক বিপর্যয়গুলোর সঙ্গে তুলনা করেন। কাগানের মতে, পার্ল হারবারে জাপানি হামলা কিংবা ভিয়েতনাম যু’\দ্ধের মতো ঘটনাগুলোর পর যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল। তবে এবারের বাস্তবতা আরও জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় শুধু সম্ভবই নয়, বরং তা ঘটার সম্ভাবনাই বেশি।” কাগানের ধারণা, ইরান কখনোই হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না, কারণ এটি তেহরানের অন্যতম প্রধান কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

পরে পিবিএস (PBS)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও কাগান একই ধরনের সতর্কতা পুনর্ব্যক্ত করেন। সেখানে তিনি বলেন, এই যু’\দ্ধ ইসরাইলের জন্যও “অত্যন্ত বিপর্যয়কর” হয়ে উঠতে পারে। তার মতে, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রভাব কমে গিয়ে সেই প্রভাব ধীরে ধীরে ইরান ও তাদের মিত্রদের দিকে সরে যেতে পারে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই