সাকিব আল হাসান (Shakib Al Hasan) বলেছেন, জাতীয় দলে খেলার অনুভূতির কোনো বিকল্প নেই। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে বাস্তবতা, বদলেছে ক্রিকেট ও রাজনীতিকে ঘিরে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও। দীর্ঘ এক আলাপচারিতায় নিজের ক্যারিয়ার, জাতীয় দল, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট, রাজনীতি, মামলার জটিলতা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক।
জাতীয় দলে না থাকা প্রসঙ্গে সাকিব বলেন, “জাতীয় দল তো জাতীয় দলই, এটার কোনো বিকল্প হয় না।” তিনি জানান, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট এখনও খেলছেন, তবে জাতীয় দলের মতো সুযোগ-সুবিধা সেখানে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো জায়গায় থাকলে ফিটনেস ও অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, এখন মূলত ফিটনেস নিয়েই কাজ করছেন। এজন্য যেকোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট খেলতে তাকে আগেভাগেই যেতে হয়। আগে যেখানে তিন দিন আগে গেলেই চলত, এখন সেখানে সাত-দশ দিন আগে গিয়ে অনুশীলন করতে হয়।
নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সাকিবের আক্ষেপ, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তিনি হয়তো সময়ের আগেই অনেক কিছু করে ফেলেছিলেন। তার ভাষায়, “অনেক কিছুই আমি প্রথম করেছি, তাই মানুষ সহজে নিতে পারেনি।” ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলা কিংবা এনডোর্সমেন্টের কারণে খেলার মাঝে ছুটি নেওয়ার বিষয়গুলো একসময় ব্যাপক সমালোচিত হলেও এখন সেগুলো অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাকিব বলেন, “আমার সময় আমি বারবার দেশদ্রোহী হয়ে যেতাম। কেউ আমাকে সাপোর্ট করেনি। তবে কাউকে না কাউকে তো শুরু করতে হয়।” তার মতে, সেই সময়ের বিতর্ক হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেটারদের জন্য পথ সহজ করেছে।
নিজের বিরুদ্ধে চলমান আইনি বিষয় নিয়েও কথা বলেন এই অলরাউন্ডার। তিনি জানান, বিষয়গুলো তার আইনজীবীরাই দেখছেন। তদন্ত শেষে যদি প্রমাণ হয় তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন, তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। আর যদি মামলা হয়, তখন জামিনের বিষয় সামনে আসবে।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথাও জানিয়েছেন সাকিব। তিনি বলেন, “মব হতে পারে, যেকোনো সন্ত্রাসী হা’\মলা হতে পারে।” মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা শত্রুতা থেকেও বিপদ আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। যদিও গ্রে’\প্তারের ভয় নেই বলেই মনে করেন, তবে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন।
আলোচনার এক পর্যায়ে সাকিব দাবি করেন, তার নাম মামলা থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে এক কোটি টাকা দাবি করা হয়েছিল। তবে তিনি মনে করেন, একবার মামলা হয়ে গেলে চাইলেই নাম সরানো সম্ভব নয়, কারণ শেষ পর্যন্ত পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনই চূড়ান্ত ভূমিকা রাখবে।
টাকা দিয়ে সমস্যা সমাধানের প্রশ্নে তিনি বলেন, “টাকা দেওয়া মানে তো আমার সমস্যা আছে, আমি বাঁচতে চাইছি।” বিষয়টিকে তিনি যৌক্তিক মনে করেন না বলেও জানান।
ক্রিকেটে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সাকিব বলেন, তার ফেরার প্রসঙ্গটা পুরোপুরি খেলার সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, বাংলাদেশ দল যদি অফ স্পিনার বা পেস বোলার খুঁজে, তাহলে তার সঙ্গে অন্যদের তুলনা চলে না, কারণ তিনি লেফট আর্ম স্পিনার।
রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া নিয়ে নিজের অবস্থানেও অনড় তিনি। সাকিব বলেন, “আমি একটা নির্দিষ্ট এলাকা থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলাম। এলাকার মানুষ ভোট দিয়েছেন বলেই আমি জিতেছি।” তার মতে, অনেকেই জাতীয় পর্যায়ের জনপ্রিয়তা ও নির্বাচনী বাস্তবতার পার্থক্যটা বোঝেন না।
রাজনীতি নিয়ে মানুষের নেতিবাচক ধারণা বদলানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, “রাজনীতি ছাড়া তো কোনো কিছু বদলানো সম্ভব নয়।” তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, দেশের অনেক রাজনীতিবিদ মানুষের সেবা করার চেয়ে ব্যক্তিগত লাভে বেশি আগ্রহী।
বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন সাকিব। তার মতে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্রিকেটাররাই। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ হারানো মানে নিজেদের অবস্থান যাচাইয়ের সুযোগও হারিয়ে ফেলা।
তিনি বলেন, “বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টেই আসল পরীক্ষা হয়। আমরা সেই পরীক্ষার সুযোগটাই হারালাম।”


