পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান (Imran Khan)-কে ক্ষমতা থেকে সরানোর পেছনে বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ফাঁস হওয়া একটি গোপন কূটনৈতিক নথি বা ‘সাইফার’ ঘিরে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গন। সেখানে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদ খান এবং মার্কিন কূটনীতিক ডোনাল্ড লুর মধ্যকার সংবেদনশীল কথোপকথনের তথ্য।
মার্কিন অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ড্রপ সাইট (Drop Site)-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জো বাইডেন প্রশাসনের সময় ২০২২ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ইসলামাবাদকে স্পষ্ট বার্তা দেয়— ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরানো গেলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন কমবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিষয়ে ইমরান খানের নিরপেক্ষ অবস্থান এবং আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযানের জন্য পাকিস্তানের ঘাঁটি ব্যবহারে অস্বীকৃতি ছিল ওয়াশিংটনের অসন্তোষের বড় কারণ। বিশেষ করে রাশিয়া-চীন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি একমত না হওয়ায় ইমরান খানের ওপর চাপ বাড়তে থাকে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই ইমরান খান অভিযোগ করে আসছেন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের কারণেই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র হয়েছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (Pakistan Muslim League-Nawaz) এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টি (Pakistan Peoples Party)-ও এতে জড়িত ছিল।
২০২২ সালের এপ্রিলের এক বক্তব্যে ইমরান খান বলেছিলেন, “আমাকে সরিয়ে দিলেই সবকিছু ক্ষমা করে দেবে আমেরিকা।” তবে সেই সময়ই যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস দাবি করেছিলেন, অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।
ড্রপ সাইটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ৭ মার্চ ডোনাল্ড লুর সঙ্গে বৈঠকে পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদ খানকে জানানো হয়, অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানকে সরানো গেলে ওয়াশিংটনের ক্ষোভ দূর হবে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে ডোনাল্ড লু মন্তব্য করেন, ইমরান খানের কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়বে।
এর এক মাসের মাথায়, ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারান ইমরান খান। পরে দুর্নীতি, আদালত অবমাননা এবং জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একাধিক মামলায় তাকে ও তার স্ত্রী বুশরা বিবি (Bushra Bibi)-কে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এরপর থেকেই তারা কারাবন্দি রয়েছেন।
শুধু ব্যক্তি ইমরান খান নন, তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (Pakistan Tehreek-e-Insaf)-এর ওপরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে দলটির নির্বাচনী প্রতীক বাতিল করা হয় এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান না নেওয়া এবং যুদ্ধ শুরুর দিনই মস্কো সফরে থাকার কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইমরান সরকারের সম্পর্ক আরও অবনতি ঘটে। একইসঙ্গে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করাও সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়িয়ে দেয়।
ড্রপ সাইটের দাবি, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর একটি অংশ তখন মনে করছিল, ইমরান খান দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে ক্রমেই বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী স্বাধীনভাবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ ও তৎপরতা বাড়ায় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পাকিস্তানের নতুন সরকার দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য গোলাবারুদ সরবরাহ শুরু করে ইসলামাবাদ। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ সহায়তার বিষয়টির সঙ্গেও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের সম্পর্ক ছিল বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ফাঁস হওয়া এই ‘সাইফার’ ঘিরে পাকিস্তানে আবারও নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একপক্ষ এটিকে বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রমাণ হিসেবে দেখছে, অন্যপক্ষ বলছে— এটি রাজনৈতিক বয়ানকে শক্তিশালী করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে পুরো ঘটনা পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিদেশি প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।


