যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া (California) অঙ্গরাজ্যের আর্কাডিয়া শহরের মেয়র আইলিন ওয়াংয়ের পদত্যাগের ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে বিদেশে চীনের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন। পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই সুসংগঠিত কৌশল অনুসরণ করছে।
৫৮ বছর বয়সী আইলিন ওয়াং সোমবার একটি ফৌজদারি অভিযোগে দোষ স্বীকারে সম্মত হয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি চীন (China)-এর পক্ষে অবৈধ বিদেশি এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। দোষী সাব্যস্ত হলে তার সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (U.S. Department of Justice)-এর নথি অনুযায়ী, ওয়াং এবং তার এক সহযোগী চীনের স্বার্থে কাজ করেছেন এবং স্থানীয় চীনা-আমেরিকান সম্প্রদায়ের সংবাদমাধ্যম পরিচয়ে পরিচালিত একটি ওয়েবসাইটে বেইজিংপন্থি প্রচারণা চালিয়েছেন।
ঘটনাটি বড় ধরনের আলোড়ন তুলেছে আর্কাডিয়ায়। বড় ও সচ্ছল চীনা-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর কারণে শহরটিকে অনেক সময় ‘চাইনিজ বেভারলি হিলস’ বলা হয়। প্রায় ৫৬ হাজার বাসিন্দার এই শহরের অর্ধেকের মতোই চীনা বংশোদ্ভূত।
২০২২ সালে সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই দায়িত্ব পালন করছিলেন ওয়াং। আর্কাডিয়ায় কাউন্সিল সদস্যদের মধ্য থেকে ঘুরিয়ে মেয়রের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং পদত্যাগের সময় তিনি সেই দায়িত্বেই ছিলেন।
শহর কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলোকে ‘গভীর উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছে। তবে একই সঙ্গে তারা বলেছে, একজন ব্যক্তির কর্মকাণ্ড দিয়ে পুরো চীনা-আমেরিকান সম্প্রদায়কে বিচার করা উচিত হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো জোশুয়া কারলান্টজিক বলেন, বিদেশে প্রভাব বিস্তারে চীনের কার্যক্রম এখন “খুবই সাধারণ” হয়ে উঠেছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের একটি বিশেষ সংস্থা রয়েছে যারা প্রবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করে বিদেশি সরকার, সমাজ ও জনমতের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায়। এর লক্ষ্য হচ্ছে ভিন্নমত কমানো, জনমত নিয়ন্ত্রণ করা এবং রাজনৈতিক আলোচনার গতিপথ প্রভাবিত করা।
তিনি বলেন, “চীন স্থানীয় থেকে জাতীয়—সব স্তরের রাজনীতিক, গণমাধ্যম ও ছাত্রগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী। এ জন্য তাদের সুসংগঠিত প্রচেষ্টা রয়েছে।”
কারলান্টজিকের মতে, স্থানীয় মেয়র বা অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের রাজনীতিকদের লক্ষ্যবস্তু করার কারণ হলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতির বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম থাকে।
তবে বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ওয়াংয়ের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ঘটনাগুলো ঘটেছে তিনি সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হওয়ার আগেই।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বিদেশি সরকারের পক্ষে কাজ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন করতে হয়। ওয়াংয়ের বিরুদ্ধে সেই নিবন্ধন না করার অভিযোগও আনা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তার ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া (University of California)-এর আইন বিশেষজ্ঞ রোজ চ্যান লুই বলেন, বিদেশি সরকারের পক্ষে জনমত প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে কাজ করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের আইনের আওতায় পড়ে।
তিনি বলেন, “আপনি যদি জানেন যে আপনার কর্মকাণ্ড কোনো বিদেশি সত্তা সম্পর্কে জনমত প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে সেই ক্ষেত্রে আইন প্রযোজ্য হতে পারে।”
জার্মান মার্শাল ফান্ডের ইন্দো-প্যাসিফিক কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ ফেলো মারেইকে ওলবার্গ বলেন, বিদেশিদের ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা চীনের দীর্ঘদিনের কৌশল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেটি আরও সংগঠিত ও পরিশীলিত হয়েছে।
বিচার বিভাগের অভিযোগে উল্লেখ করা একটি লেখায় বলা হয়েছিল, শিনজিয়াংয়ে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ বা ‘গণহ’\ত্যা’ হয়নি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীনের দমন-পীড়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার পাল্টা বয়ান হিসেবেই এ ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
উইঘুর-আমেরিকান অধিকারকর্মী রুশান আব্বাস বলেন, এই ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে যে বিশ্বজুড়ে ভিন্নমত দমন ও জনমত নিয়ন্ত্রণে চীন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তার ভাষায়, “এটি উদ্বেগজনক, তবে বিস্ময়কর নয়।”
এদিকে আর্কাডিয়া সিটি কাউন্সিল সদস্য শ্যারন কোয়ান দাবি করেছেন, গত এক বছর ধরেই তিনি স্বচ্ছতা ও বিদেশি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। তবে কাউন্সিল বিষয়টির গুরুত্ব যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি।
অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত মেয়র পল চেং সতর্ক করে বলেছেন, গুজব বা অনুমানের ভিত্তিতে তদন্ত চালানো হলে তা বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে। তিনি রাজনৈতিক বিতর্কে না জড়িয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার আহ্বান জানান।
ওয়াংয়ের আইনজীবীরা এক বিবৃতিতে বলেছেন, ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ঘটনার কারণে তিনি “ভুল পথে পরিচালিত” হয়েছেন। তবে তিনি অভিযোগের গুরুত্ব স্বীকার করেছেন এবং নিজের ভুলের দায় নিতে প্রস্তুত।
আর্কাডিয়ার সিটি ম্যানেজার ডমিনিক লাজারেত্তো জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যালোচনায় শহরের অর্থ, কর্মী বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ওয়াংয়ের কর্মকাণ্ডের কোনো প্রভাব পাওয়া যায়নি। প্রয়োজনে ফেডারেল কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আগামী ২৯ মে আদালতে হাজির হওয়ার কথা রয়েছে আইলিন ওয়াংয়ের।


