ইরান যুদ্ধের পর উপসাগরীয় দেশগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়ায় কড়াকড়ি, গ্রে’\প্তার-বহিষ্কারের অভিযোগ

ইরান (Iran)-এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি উপসাগরীয় দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করা হয়েছে। অনলাইনে পোস্ট, ভিডিও, মন্তব্য কিংবা প্রতিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বহু মানুষ গ্রে’\প্তার, বিচার এবং বহিষ্কারের মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব কনটেন্ট জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে অথবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দিচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

বাহরাইন (Bahrain) সম্প্রতি ৬৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিলের ঘোষণা দেয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, “শত্রুভাবাপন্ন ইরানি কর্মকাণ্ডকে সমর্থন বা প্রশংসা করা এবং বাইরের পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের” অভিযোগে তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে।

একই সময়ে কুয়েত (Kuwait)-এও সামাজিক মাধ্যম সংশ্লিষ্ট মামলায় ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনা ঘটেছে। কয়েক সপ্তাহ তদন্ত ও আটক রাখার পর দেশটির নিরাপত্তা আদালত ১৩৫ জনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। এর মধ্যে ১৭ জনকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং এক পলাতক আসামিকে ১০ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া ১০৯ জনকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পোস্ট মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আর নয়জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল ভুয়া তথ্য প্রচার, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো, মোবাইল ফোনের অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দুর্বল করার চেষ্টা।

খালাস পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত লেখক ও সাংবাদিক আহমেদ শিহাব-এলদিন। পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে কুয়েতে গিয়ে তিনি আটক হন। তার বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করা ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ আনা হলেও ৫২ দিন পর আদালত তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে।

যুদ্ধ শুরুর পর কুয়েত সরকার নতুন একটি ডিক্রি জারি করেছে, যেখানে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো তথ্য প্রকাশের জন্য তিন থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী বিষয়ে বিশেষ আদালত গঠনের কথাও জানানো হয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International)-এর গবেষক মাহমুদ শ্যালাবি বলেন, এসব পদক্ষেপের ফলে ভয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

একজন কুয়েতি নাগরিকের দাবি, শুধু পোস্ট করাই নয়—কোনো পোস্টে লাইক দেওয়া বা প্রতিক্রিয়া জানানোর কারণেও মানুষকে গ্রে’\প্তার করা হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আটক হওয়া ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ শিয়া সম্প্রদায়ের।

তিনি আরও জানান, বিদেশি নাগরিকদের অনেককে বহিষ্কারের আগে ডিপোর্টেশন সেন্টারে রাখা হয়েছে। আইনজীবীদের আশঙ্কা, দোষী সাব্যস্ত হলে কিছু ব্যক্তির নাগরিকত্বও বাতিল হতে পারে।

কুয়েতের নতুন নাগরিকত্ব আইনে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, ধর্ম কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ক্ষতি হলে নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া শত্রুভাবাপন্ন বিদেশি রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করলেও নাগরিকত্ব বাতিল করা যেতে পারে।

বাহরাইনেও একই ধরনের পরিস্থিতির অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর সেখানে দমন-পীড়ন বেড়েছে এবং সামাজিক মাধ্যমে মত প্রকাশের কারণে বহু মানুষ আটক হয়েছেন। একজন বাহরাইনি কর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০৪ জনকে গ্রে’\প্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে নারী, কিশোর ও বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।

তবে বাহরাইনের কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব গ্রে’\প্তার শুধুমাত্র অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে করা হয়েছে। সরকারের দাবি, বিদেশি রাষ্ট্র বা ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের মতো সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও কয়েকটি দেশ যুদ্ধসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ ও বিদেশি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা (BBC Bangla)