কর্মশালা-সেমিনারের নামে বছরে হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত আয়, আমলাদের ‘সম্মানী সংস্কৃতি’ নিয়ে প্রশ্ন

সরকারি অফিস সময়েই চলছে অনলাইন কর্মশালা, সেমিনার, প্রশিক্ষণ ও ভার্চুয়াল বৈঠক। নিজ নিজ দপ্তরে বসে এসব আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, আর বিনিময়ে পাচ্ছেন বেতন-ভাতার বাইরের অতিরিক্ত সম্মানী। প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ‘সম্মানী সংস্কৃতি’ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, শুধু কর্মশালা নয়— সরকারি বিভিন্ন কমিটি, নিয়োগ বোর্ড, প্রশিক্ষণ, ক্রয়সংক্রান্ত বৈঠক ও সেমিনারের মাধ্যমে বছরে হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব সুবিধা মূলত ভোগ করেন ঊর্ধ্বতন ও প্রভাবশালী কর্মকর্তারা। অথচ একই কাজে সাচিবিক সহায়তা দেওয়া অধস্তন কর্মচারীরা কোনো সম্মানী পান না। এতে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি দায়িত্ব পালন করেই অতিরিক্ত সম্মানী নেওয়া মূলত ক্ষমতার অপব্যবহার। তারা বলছেন, যেসব কর্মকর্তা নিজেরাই আইন ও বিধি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত, তারাই এসব সুবিধা ভোগের পথ তৈরি করেছেন।

বর্তমান সরকার যখন কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসেবে ব্যয় সংকোচনের নানা উদ্যোগ নিয়েছে, তখন এই অতিরিক্ত ব্যয় আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman) ইতোমধ্যেই নিজের প্রটোকল ফোর্স, গাড়িসহ বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা বাতিল করেছেন। সরকার ও বিরোধীদলীয় এমপিরাও শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা না নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

গত ৫ এপ্রিল মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাজনিত জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার পরিচালন ব্যয় কমানোর জন্য একটি পরিপত্র জারি করে। সেখানে সরকারি অর্থায়নে সব বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বন্ধ এবং অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ব্যয় ৫০ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সভা-সেমিনারে আপ্যায়ন ব্যয় ৫০ শতাংশ এবং সেমিনার-কনফারেন্স ব্যয় ২০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্তও জানানো হয়।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী (Md. Abdul Bari) বলেন, বিষয়টি ভালোভাবে খতিয়ে দেখে প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি নিয়োগ ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটির সদস্যদের জন্য নির্ধারিত সম্মানী রয়েছে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি, মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষা বোর্ডের সদস্যরা জনপ্রতি পান ৬ হাজার টাকা। আবার ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুপারিশকারী ‘সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড’ সদস্যরা বৈঠকপ্রতি পান ১০ হাজার টাকা।

এছাড়া সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত সভাগুলোতেও মোটা অঙ্কের সম্মানী নির্ধারণ করা আছে। সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) অনুযায়ী, ১০ কোটি টাকার বেশি কেনাকাটার সভায় সদস্যরা পান ৫ হাজার টাকা করে। ১ কোটি টাকার বেশি হলে ৩ হাজার, ১০ লাখ টাকার বেশি হলে দেড় হাজার এবং ১০ লাখ টাকার কম হলে ১ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়া হয়। একই ধরনের সুবিধা পান মূল্যায়ন ও কারিগরি পরীক্ষণ কমিটির সদস্যরাও।

অর্থ বিভাগের তথ্য বলছে, শুধু প্রশিক্ষণ খাতেই ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণে মোট ব্যয় হয়েছে ১৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা।

তবে প্রশাসনে এই খাত ঘিরে অনিয়মের অভিযোগও কম নয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ বা কর্মশালা না করেই জালিয়াতির মাধ্যমে সম্মানীর টাকা তুলে নেওয়ার নজির রয়েছে।

এর একটি আলোচিত উদাহরণ বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড বা বিআরডিবি (BRDB)-এর একটি ঘটনা। ২০২০ সালের ৫ এপ্রিল ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার রূপকার’ শীর্ষক একটি কর্মশালার নামে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। অথচ সে সময় করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে দেশজুড়ে কঠোর লকডাউন চলছিল এবং সরকারি দপ্তরও বন্ধ ছিল। পরে অডিট প্রতিবেদনে উঠে আসে, ওই সময় ভুয়া সভা, সেমিনার ও প্রশিক্ষণের নামে প্রায় ৩৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছিল।

এ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (Transparency International Bangladesh-TIB)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান (Dr. Iftekharuzzaman) বলেন, “কর্মশালা, প্রশিক্ষণ বা কমিটির বৈঠক সরকারি কাজের অংশ। এটি কর্মকর্তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। সম্মানীর নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার এবং এটি উত্তম চর্চার মধ্যে পড়ে না।”

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া (Md. Firoz Mia) মনে করেন, দায়িত্বের বাইরে অতিরিক্ত কোনো কাজ করলে সামান্য টোকেন সম্মানী দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার সভা বা বোর্ড মিটিংয়ের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া গরিব দেশের বাস্তবতায় দৃষ্টিকটু।

তার ভাষায়, “বিদেশে এসব ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের সম্মানী নয়, বরং ফুলের তোড়া বা ছোট উপহার দেওয়া হয়। আমাদের দেশে এটি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।”