সিলেটে পা’\কিস্তানকে হা’\রিয়ে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখল বাংলাদেশ

বাংলাদেশ (Bangladesh) টেস্ট ক্রিকেটে আরও একটি স্মরণীয় দিন দেখল সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। পা’\কিস্তানের বিপক্ষে টানা চার টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়ে দুই ম্যাচের সিরিজ ২–০ ব্যবধানে নিজেদের করে নিয়েছে স্বাগতিকরা। পঞ্চম ও শেষ দিনে ৭৮ রানের জয়ে শুধু সিরিজ নিশ্চিত হয়নি, দেশের টেস্ট ইতিহাসেও নতুন এক মাইলফলক যোগ হয়েছে।

৪৩৭ রানের কঠিন লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চতুর্থ দিন শেষে পা’\কিস্তানের সংগ্রহ ছিল ৭ উইকেটে ৩১৬ রান। হাতে তখনও ছিল তিন উইকেট, আর জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল আরও ১২১ রান। ফলে শেষ দিনের সকালটা ছিল চরম উত্তেজনায় ভরা। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ছিল দ্রুত আঘাত, আর পা’\কিস্তানের জন্য ছিল ধৈর্য ও সাহসের পরীক্ষা।

তবে দিনের শুরুতেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় সিলেটের আবহাওয়া। সকাল ১০টায় খেলা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কালো মেঘ আর সকালের বৃষ্টিতে নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট পরে মাঠে গড়ায় খেলা। কাভার সরিয়ে মাঠ প্রস্তুত করার পর দুই দল ওয়ার্মআপ শেষে মাঠে নামে।

খেলা শুরু হতেই পাকিস্তান (Pakistan) ইতিবাচক ব্যাটিংয়ের ইঙ্গিত দেয়। মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান দ্রুত রান তুলতে থাকেন। নাহিদ রানার প্রথম ওভার থেকেই চাপে পড়ে বাংলাদেশ। প্রথম চার ওভারে তারা যোগ করেন ২৫ রান। ৯৩তম ওভারে নাহিদের বাউন্সারে সাজিদের ব্যাটে লেগে বল আকাশে উঠলেও উইকেটকিপার লিটন দাস ও শর্ট স্কয়ার লেগে থাকা তাইজুল ইসলামের মাঝখানে বল পড়ে যাওয়ায় বড় সুযোগ হাতছাড়া হয় বাংলাদেশের।

কিন্তু সেই আক্ষেপ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় ৯৬তম ওভারে। তাইজুল ইসলাম (Taijul Islam) স্লিপে দাঁড়িয়ে থাকা নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে ক্যাচ তুলতে বাধ্য করেন সাজিদ খানকে। ২৮ রান করা সাজিদের বিদায়ে ভাঙে ৫৪ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। তখন পা’\কিস্তানের স্কোর ৩৫৮/৮, আর বাংলাদেশ ফিরে পায় নিয়ন্ত্রণ।

এরপরই আরও বড় ধাক্কা দেন শরীফুল ইসলাম (Shoriful Islam)। নিজের ওভারের প্রথম বলেই গালিতে থাকা মিরাজের হাতে ক্যাচ দেন ৯৪ রান করা মোহাম্মদ রিজওয়ান। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ছয় রান দূরে থেমে যায় তার অসাধারণ লড়াই। সেই উইকেটের পর থেকেই কার্যত ম্যাচ বাংলাদেশের মুঠোয় চলে আসে।

শেষ উইকেটে খুররম শাহজাদ ও মোহাম্মদ আব্বাস কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাইজুল ইসলামের ঘূর্ণিতে সেই প্রতিরোধও বেশিক্ষণ টেকেনি। ৯৮তম ওভারের দ্বিতীয় বলে বড় শট খেলতে গিয়ে ওয়াইড লং অনে তানজিদ হাসানের হাতে ক্যাচ দেন খুররম শাহজাদ। তার বিদায়ের মধ্য দিয়েই ৩৫৮ রানে অলআউট হয় পা’\কিস্তান। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে উল্লাসে ফেটে পড়ে গ্যালারি।

পুরো টেস্টজুড়ে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের নেতৃত্ব দেন তাইজুল ইসলাম। দ্বিতীয় ইনিংসে ১২০ রানে ৬ উইকেট নিয়ে তিনি একাই গুঁড়িয়ে দেন পা’\কিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ। ম্যাচে মোট শিকার করেন ৯ উইকেট। টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি তার ১৮তম পাঁচ উইকেটের কীর্তি। নাহিদ রানা নেন ২ উইকেট এবং মিরাজ যোগ করেন ১টি।

এর আগে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে বড় বিপর্যয়ের মুহূর্তে দলকে টেনে তোলেন লিটন দাস (Litton Das)। তার ১২৬ রানের দুর্দান্ত ইনিংস ২৭৮ রানের ভিত গড়ে দেয়। পরে দ্বিতীয় ইনিংসে মুশফিকুর রহিম ও লিটনের গুরুত্বপূর্ণ জুটিতে বাংলাদেশ পায় বড় সংগ্রহ, যা শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

পুরস্কার বিতরণীতে ম্যাচসেরা লিটন দাস বলেন, ‘দুটি বাউন্ডারি মারার পর বুঝেছি এটা টেস্ট ক্রিকেট, সময় নিয়ে খেলতে হবে। বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল, তাই ভেবেছিলাম কিছুক্ষণ টিকে থাকতে পারলে ম্যাচের চিত্র বদলে যেতে পারে।’

সিরিজসেরা মুশফিকুর রহিম (Mushfiqur Rahim) পুরো দলের কৃতিত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে দল যেভাবে খেলছে, এই সাফল্য পুরো দলের।’

এই ঐতিহাসিক জয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকাতেও বড় অগ্রগতি হয়েছে বাংলাদেশের। ৫৮.৩৩ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে ভারতকে পেছনে ফেলে পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে টাইগাররা। সিলেটের এই জয় তাই শুধু একটি সিরিজ জয় নয়, বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসেরও নতুন ঘোষণা।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ: ২৭৮ ও ৩৯০

পা’\কিস্তান: ২৩২ ও ৩৫৮

ফল: বাংলাদেশ ৭৮ রানে জয়ী

ম্যাচসেরা: লিটন দাস

সিরিজসেরা: মুশফিকুর রহিম

সিরিজ ফল: বাংলাদেশ ২–০ ব্যবধানে জয়ী