ভারতে বিজেপিকে ছাপিয়ে আলোচনায় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, তরুণদের ক্ষোভের নতুন প্রতীক সিজেপি

ভারতের রাজনীতিতে অস্বাভাবিক এক অনলাইন প্রবণতা এখন নতুন বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তেলাপোকাকে প্রতীক হিসেবে নেওয়া এই উদ্যোগ কয়েক দিনের মধ্যেই এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেটি এখন মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনারও অংশ হয়ে গেছে।

ঘটনার সূত্রপাত সূর্য কান্ত (Surya Kant)-কে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া একটি বিতর্ক থেকে। ভারতের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি ওঠে, আদালতের এক শুনানিতে তিনি সাংবাদিকতা ও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ বলে মন্তব্য করেছেন। পরে অবশ্য তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, সাধারণ তরুণদের উদ্দেশ করে নয়, বরং ভুয়া ডিগ্রিধারীদের প্রসঙ্গেই ওই মন্তব্য করা হয়েছিল।

কিন্তু ততক্ষণে বিষয়টি অনলাইনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। সেই প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় তৈরি হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি—যার নামটি স্পষ্টভাবেই ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party)-এর ব্যঙ্গাত্মক রূপ।

যদিও সিজেপি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, মিম সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল প্রতিবাদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। তাদের সদস্য হওয়ার শর্তও রাখা হয়েছে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে—‘বেকার, অলস, সবসময় অনলাইনে থাকা এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশের সক্ষমতা থাকতে হবে।’

এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন অভিজিৎ দিপকে (Abhijeet Dipke), যিনি বর্তমানে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এর আগে তিনি আম আদমি পার্টি (Aam Aadmi Party)-র সঙ্গেও কাজ করেছেন। তার ভাষায়, পুরো বিষয়টি শুরু হয়েছিল নিছক একটি রসিকতা হিসেবে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি বড় আকার ধারণ করে।

কয়েক দিনের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ গুগল ফর্মের মাধ্যমে সিজেপির সদস্য হওয়ার জন্য নিবন্ধন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে #MainBhiCockroach হ্যাশট্যাগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী নেতা অখিলেশ যাদব (Akhilesh Yadav) পর্যন্ত এক পোস্টে লিখেছেন, ‘বিজেপি বনাম সিজেপি’।

অনলাইনের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব জীবনেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি ও বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কিছু তরুণকে তেলাপোকার পোশাক পরে দেখা গেছে। এই প্রতীকী উপস্থিতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সিজেপির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা। কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা এক কোটির বেশি ছাড়িয়ে যায়। দাবি করা হচ্ছে, এই সংখ্যা বিজেপির অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের অনুসারীকেও অতিক্রম করেছে। তবে সিজেপির এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট বর্তমানে ভারতে অদৃশ্য অবস্থায় রয়েছে। সেখানে প্রবেশ করতে গেলে দেখা যাচ্ছে—‘আইনি অনুরোধের প্রেক্ষিতে অ্যাকাউন্টটি আটকে দেওয়া হয়েছে’—এমন বার্তা।

সমর্থকদের ভাষ্য, এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশে সিজেপি নতুন ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। বিরোধী নেত্রী মহুয়া মৈত্র, রাজনীতিক কীর্তি আজাদ এবং আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের মতো ব্যক্তিরাও এই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, এটি মূলত বিরোধী ঘরানার ডিজিটাল রাজনৈতিক প্রচারণা, যা পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে এবং যার লক্ষ্য রাজনৈতিক অসন্তোষকে অনলাইনে আরও উসকে দেওয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপির দ্রুত উত্থান ভারতের তরুণ সমাজের হতাশা, ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভারতের অনেক তরুণ নিজেদের প্রতিনিধিত্বহীন বলে মনে করছেন। কর্মসংস্থানের সংকট, বৈষম্য এবং বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, অথচ প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

সিজেপির ওয়েবসাইটেও সেই মানসিকতার প্রতিফলন স্পষ্ট। নিজেদের তারা ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে তুলে ধরছে। একই সঙ্গে জবাবদিহি, গণমাধ্যম সংস্কার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির মতো বিষয়ও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এটি হয়তো শেষ পর্যন্ত সাময়িক অনলাইন ট্রেন্ড হিসেবেই মিলিয়ে যেতে পারে। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সিজেপি ভারতের তরুণদের একাংশের হতাশা ও ক্ষোভকে নতুন ভাষা দিয়েছে—এ নিয়ে দ্বিমত কম।